জাতি যখন কোনো ক্রান্তিকাল অতিবাহিত করে, সকলের মুখে যখন 'পরিস্থিতি ভালো নহে, কোথাও সুখ নাই, শান্তি নাই' ইত্যাদি বাক্য শোনা যায়, ঠিক তখনো একটি পক্ষ বা গোষ্ঠী 'বহাল তবিয়তে ভালো' থাকে। ক্রাইসিস মোমেন্টেও অনেকের এই ভালো থাকিবার রহস্য কী? এই প্রশ্নের যথোপযুক্ত উত্তর হইতে পারে, আকালের মধ্যেও তাহাদের পকেট গরম রাখিবার 'বুদ্ধি'।
আরেকটি প্রশ্নও স্বভাবতই সম্মুখে চলিয়া আসে; সেটি হইল, কঠিন সময়ে সকলে যেইখানে দুর্ভোগের মুখে উপনীত হন, সকলের নাভিশ্বাস উঠে, সেইখানে তাহারা কী এমন জাদুর কাঠি পান যে, দুর্বিষহ-বিপর্যয়কর পরিস্থিতিও তাহাদের নিকট পরম সুখকর হইয়া উঠে, সেই 'সৌভাগ্যবান' ব্যক্তিবর্গের দিন ঘুরিয়া যায়? দিন কয়েক পূর্বে পরোক্ষভাবে হইলেও ইহার উত্তর দিয়াছেন খোদ অন্তর্বর্তী সরকারের এক উপদেষ্টা। তিনি তাহার এক বক্তৃতার মাঝখানে বলিয়াছেন, 'তাহাদের কারণে আমরা পদে পদে বাধা পাইতেছি।' খোদ উপদেষ্টাদের কাজকর্মকে বাধাগ্রস্ত করিয়া তোলে, এমন মহাশক্তিধর কে বা কাহারা? অবশ্য তাহারা যেন সত্যিই মহাপ্রতাপশালী; কারণ, ঐ উপদেষ্টা পর্যন্ত বলিয়াছেন যে, আমি তাহাদের নাম বলিতে পারিব না। আপনারা সকলেই জানেন।
'ধর্মের কল বাতাসে নড়ে' বলিয়া বাংলায় একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ রহিয়াছে। এই সকল মারফতি প্রবাদের কল্যাণে অনেক কিছুই ঢাকিয়া রাখা যায় না; যেমন, চাপা থাকে না সেই সকল ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মহান কীর্তিকলাপ! মাননীয় উপদেষ্টার মুখে তাহাদের নাম উচ্চারণ না করিলেও সকলেই জানেন, সেই 'তাহারা' হইল এমন এক নিচু-হীন শ্রেণি, যাহাদের আমরা খাঁটি বাংলায় 'চাঁদাবাজ' বলিয়া থাকি; অনেকে বলিয়া থাকেন 'চ্যাঁচড়াবাজ'। এই বঙ্গে এই শ্রেণির অস্তিত্ব নূতন নহে, বরং তাহাদের যেন কখনোই বিলুপ্তি ঘটে না। কি সুসময় কি দুঃসময়-সকল কালেই কেবল তাহাদের রাজ চলে। বর্তমানে আমরা কি ইহাই প্রত্যক্ষ করিতেছি না? মাঠে-ঘাটে, শহরে-নগরে কোথায় নাই তাহারা? দোকানপাট, মার্কেট-পরিবহন কিংবা সেবামূলক খাত-কোথায় পড়িতেছে না পদযুগল? বরং বলিতে হয়, তাহাদের নিকট ব্যবসায়ী-পাবলিক সকলে যেন জিম্মি হইয়া পড়িয়াছেন, যাহা আমরা প্রতিদিন পত্রপত্রিকাগুলির শিরোনামে প্রত্যক্ষ করিয়া থাকি।
মুশকিল হইল, এই গোষ্ঠী 'টাইমিং' বুঝিয়া চলিতে সিদ্ধহস্ত। অর্থাৎ, তাহারা বেশ ভালোমতো বুঝিতে পারে, ঝোপ বুঝিয়া কীভাবে এবং কখন কোপ দিতে হইবে। ইহাই আমরা ফি বৎসর লক্ষ করিয়া থাকি-রমজানসহ বিভিন্ন পার্বণে তাহাদের দৌরাত্ম্য এতটাই বাড়িয়া যায় যে, তাহাতে জনজীবন হইয়া উঠে অতিষ্ঠ। এই অপকর্ম করিতে তাহারা রীতিমতো সিন্ডিকেট গাড়িয়া বসে। সন্দেহের অবকাশ থাকে না যে, এই বার ইহার বিপরীত চিত্র পরিলক্ষিত হইবে এবং সেই কারণেই সম্প্রতি ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় আসন্ন রমজান মাসে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে চাঁদাবাজি বন্ধ করিবার দাবি জানাইয়াছে।
চাঁদাবাজদের দাপট কতটা বাড়িয়া গিয়াছে, তাহা ব্যবসায়ীদের কথাতেই পরিষ্কার বোঝা যায়; যেমন-এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করিয়া বলিয়াছেন যে, ট্রাকে মালপত্র উঠানোর সময় এক বার, নামানোর সময় আরেক বার চাঁদা দিতে হইতেছে। পরিতাপের বিষয় হইল, সেই সকল চাঁদাবাজের সহিত দহরম-মহরম সম্পর্ক রহিয়াছে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর-ইহা অবশ্য নূতন প্রবণতা নহে; কিন্তু সমস্যার জায়গাটি হইল, ঐ ব্যবসায়ী আক্ষেপ করিয়া বলিয়াছেন, 'সরকার এই বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ লইতেছে না!'
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিবেশ স্বাভাবিকভাবেই বিরূপ ও প্রতিকূল হইয়া উঠিয়াছে। তবে এই কঠিন পরিস্থিতিতেও বন্ধ হয় নাই চাঁদাবাজিশিল্পের প্রকোপ। ইহার কারণে ব্যবসায়ীদের বিড়ম্বনা যেমন বৃদ্ধি পাইতেছে, পাশাপাশি হুহু করিয়া বাড়িয়া যাইতেছে পণ্য ও সেবার মূল্য। এই চাঁদাবাজদের থামানো না গেলে আসন্ন পবিত্র রমজান মাসে পণ্যসামগ্রী মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাহিরে চলিয়া যাইবে, যাহা কেবল অস্থিরতারই জন্ম দিবে। সুতরাং, সরকারের উচিত হইবে, এই বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিকট হইতে চলমান মুহূর্তে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত এবং চাঁদাবাজদের দমনে গ্রহণ করা হউক 'জিরো টলারেন্স' নীতি। জনগণের ভালো থাকিবার স্বার্থে যে কোনো মূল্যে ইহাদের রুখিয়া দেওয়া একটি সরকারের অন্যতম দায়; কিন্তু কে শুনিবে কাহার কথা!
