দুধে সমৃদ্ধ সাতক্ষীরা, সংকটে খামারির ন্যায্যতা

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৫১

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জিয়ালা গ্রামের মানুষের প্রধান পেশা এখন গরু পালন। এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া কঠিন, যাদের গরু নেই। অনেকের উঠানই আর নেই—সেখানে গড়ে উঠেছে গরুর ঘর। দেশি গরুর পাশাপাশি ফ্রিজিয়ান, জার্সি ও শাহিওয়াল সংকর জাতের গরু পালন করে এই গ্রাম এখন পরিচিত ‘দুগ্ধ পল্লি’ বা ‘ডেইরি ভিলেজ’ হিসেবে। আশির দশক থেকেই এখানে উন্নত জাতের গরু পালনের প্রচলন শুরু হয়।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দুধ উৎপাদনে সারা দেশে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সাতক্ষীরা জেলা। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এফ এম মান্নান কবীরের তথ্যমতে, বর্তমানে জেলায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭ লাখ ৬৫ হাজার ৯০৪ লিটার দুধ উৎপাদিত হচ্ছে। এ জেলার নিজস্ব প্রায় ৬ লাখ ৬১ হাজার ৫৯৫ লিটার চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত ১ লাখ ৪ হাজার ৩০৯ লিটার দুধ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে, যার আনুমানিক দৈনিক বাজারমূল্য প্রায় ৭৪ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪০ টাকা। তবে অভিযোগ আছে, এত বড় উৎপাদন ও বাজার থাকা সত্ত্বেও খামারিরা ন্যায্য দাম পান না ।

বর্তমানে জেলায় প্রায় ১২ হাজার ৮৮৬টি ছোট-বড় খামার রয়েছে, যদিও সরকারি নিবন্ধিত খামার মাত্র ৩০৪টি। এই ডেইরি শিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ কর্মসংস্থানে যুক্ত। তবে বাস্তবতা হলো, খামারিরা খামার থেকে দুধ বিক্রি করতে
বাধ্য হচ্ছেন প্রত্যাশিত মূল্যের চেয়ে কম দামে। অধিকন্তু, গোখাদ্যের দামও বাড়তি বিধায় লাভের অঙ্ক ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও স্থানীয় ক্ষমতার জটিল সমীকরণ। খামারিদের ক্ষোভ আরো বাড়ে, যখন তারা দেখেন—একদিকে প্রকৃত দুধ উৎপাদন করে লোকসান গুনতে হচ্ছে, অন্যদিকে বাজারে নকল ও ভেজাল দুধের দৌরাত্ম্য চলছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে কৃত্রিমভাবে দুধ তৈরির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, যা প্রকৃত দুধের বাজারকে আরো চাপে ফেলছে ।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রথমত, সরকারিভাবে দুধের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (Minimum Support Price ) নির্ধারণ জরুরি। গোখাদ্যের দামের সঙ্গে দুধের দাম সমন্বয়ের বাস্তবভিত্তিক ফর্মুলা ছাড়া প্রান্তিক খামারিরা টিকে থাকতে পারবেন না । 

দ্বিতীয়ত, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমাতে খামারি-নিয়ন্ত্রিত ডেইরি সমবায় জোরদার করা প্রয়োজন। ভারতের 'আমুল মডেল'-এর আদলে ১৯৭৩ সালে গড়ে ওঠা মিল্কভিটাকে স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে পুনর্গঠন করা গেলে ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা সম্ভব। 

তৃতীয়ত, খামারি- নিয়ন্ত্রিত চিলিং সেন্টার ও দুধ সংগ্রহ কেন্দ্ৰ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি গোখাদ্যের বাজারে ভর্তুকি ও মান নিয়ন্ত্রণ জরুরি।

জিয়ালা গ্রাম প্রমাণ করেছে — সঠিক পরিবেশ পেলে গ্রামই হতে পারে শিল্পের কেন্দ্র। এখন প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও নীতিগত সহায়তা। নইলে যে গ্রাম দেশের দুধের চাহিদা পূরণ করছে, সেই গ্রামের খামারিরাই একদিন এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন—যা হবে দেশের ডেইরি শিল্পের জন্য এক অশনিসংকেত।

লেখক: তরুণ গবেষক ও এমএস শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

ইত্তেফাক/এএইচপি