গ্যাসবেলুন বিস্ফোরণ ও জননিরাপত্তার সংকট

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:৪০

রাজধানী ঢাকার নিকটস্থ টঙ্গীর হোন্ডা রোড এলাকায় নির্বাচনি গণমিছিল উপলক্ষ্যে আনীত গ্যাসবেলুন বিস্ফোরণে শিশুসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তির দগ্ধ হওয়ার সংবাদটি অতীব মর্মান্তিক ও উদ্বেগজনক। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, একটি শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীর গণমিছিলের প্রাক্কালে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। আহতদের মধ্যে ১২ জনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হইয়াছে। এই ঘটনা আমাদের প্রশাসনিক ও সামাজিক অসচেতনতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি বলিলেও অত্যুক্তি হয় না।

বিভিন্ন উৎসব-পার্বণ কিংবা রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে বর্ণিল বেলুন উড়াইবার রেওয়াজ বহু পুরাতন; কিন্তু ইদানীংকালে হিলিয়াম গ্যাসের পরিবর্তে স্বল্পমূল্যের ও উচ্চ দাহ্যক্ষমতাসম্পন্ন হাইড্রোজেন গ্যাসের ব্যবহার যেই হারে বৃদ্ধি পাইয়াছে, তাহা আতঙ্কজনক। এই ধরনের এক একটি বেলুন এক একটি বোমা বই কিছুই নহে। সামান্য ঘর্ষণ, অগ্নিকণা কিংবা উত্তাপের সংস্পর্শে আসিলে এই গ্যাসবেলুন ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটাইতে পারে। জনবহুল এলাকায় এই প্রকার ঝুঁকিপূর্ণ দাহ্য পদার্থ লইয়া মিছিল বা সমাবেশের আয়োজন করা যে কতটা বিপজ্জনক হইতে পারে, টঙ্গীর এই দুর্ঘটনা তাহাই প্রমাণ করিল। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর-১১ এলাকায় গ্যাসবেলুন বিস্ফোরণে অকালে ঝরিয়া পড়ে ছয়টি শিশুর প্রাণ। এই সকল হতভাগ্য শিশু বেলুনবিক্রেতার নিকট হইতে বেলুন ক্রয় করিতে ছিল। এই ধরনের গ্যাসবেলুন বিক্রেতারা যেন এক একজন মৃত্যুর ফেরিওয়ালা! ২০১৮ সালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর শেখদি বটতলা গুটিবাড়ীর একটি টিনশেড বাসায় গ্যাসবেলুন কারখানায় বিস্ফোরণের ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মারা যান দুই জন। একই রকম দুর্ঘটনা ঘটে মিরপুর এক নম্বরের ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের সম্মুখে। বেলুনে গ্যাস ভরিবার সময় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে বেলুন বিক্রেতা নিজেই উড়িয়া যান। ইহাতে একাধিক খুদে শিক্ষার্থী আহত হয়। একই বৎসর একটি ছাত্রসংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত শোভাযাত্রায় যোগ দিতে যাওয়ার সময় ফার্মগেট এলাকায় বাসের মধ্যে কর্মীদের হাতে থাকা গ্যাসবেলুন বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ হন ১০ জন।

আমরা জানি, দেশের বিভিন্ন খাতে গ্যাসের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কাজ করে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) এবং এই ক্ষেত্রে প্রধান বিস্ফোরক কর্মকর্তার দপ্তর হইতে লাইসেন্স নিতে হয়; কিন্তু গ্যাসবেলুনে যে হাইড্রোজেন গ্যাস ব্যবহৃত হয়, তাহা বিভিন্ন রাসায়নিকের সংমিশ্রণে তৈরি। সিলিন্ডারের ভিতরে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সৃষ্ট হাইড্রোজেন গ্যাস দিয়া বেলুন ফুলানো হয়। সচরাচর বেলুন বিক্রেতারাই এই সকল কাজ জীবনের ঝুঁকি লইয়া করিয়া থাকেন। তাহাদের রাসায়নিক সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান নাই বলিলেই চলে। এইভাবে গ্যাস তৈরি ও বেলুনে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। তবু যত্রতত্র ঝুঁকি লইয়া এই সকল গ্যাস তৈরি এবং তাহা বেলুনে ব্যবহার করা হইতেছে, যাহা দুঃখজনক। এই ব্যাপারে রাজনৈতিক কর্মীরাই যদি সচেতন না হন, তাহা হইলে তাহারা কীভাবে জনগণকে সচেতন করিবেন? গ্যাসবেলুনের কারবারিরা শুধু অ্যাসিড এবং অ্যালুমিনিয়ামসহ বিভিন্ন ধাতু মিশাইয়া হাইড্রোজেন গ্যাস বানায়। তাই এইভাবে অনুমোদনহীন গ্যাস তৈরি ও তাহার ব্যবহার বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। বাণিজ্যিকভাবে হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপাদনে অনেক প্রক্রিয়া অবলম্বন করিতে হয়; কিন্তু যাহারা বেলুনে এই গ্যাস ব্যবহার করেন, তাহারা বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক এই কাজটি করিয়া থাকেন নিয়মকানুন না মানিয়াই। এমতাবস্থায় বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হইল, হিলিয়াম গ্যাস দিয়া বেলুন ফুলানো উচিত; কিন্তু হিলিয়ামের মূল্য অধিক হওয়ায় বেলুন বিক্রেতারা নিজেরাই এই সকল হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করিতেছে জীবনের ঝুঁকি লইয়া।

উপর্যুক্ত পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলসহ সকল সামাজিক সংগঠনের নিকট আমাদের সনির্বন্ধ অনুরোধ—উৎসব বা কর্মসূচির আতিশয্যে সাধারণ মানুষের জীবন যেন বিপন্ন না হয়, তাহা নিশ্চিত করা সকলেরই নৈতিক দায়িত্ব। প্রশাসনকেও এই বিষয়ে কঠোর নজরদারি চালাইতে হইবে। ভবিষ্যতে যাহাতে এই প্রকার অনাকাঙ্ক্ষিত ও মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেই জন্য বেলুন তৈরিতে ব্যবহৃত গ্যাসের মান যাচাই ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন