মহান সৃষ্টিকর্তা এই ধরণিকে এমন এক অপূর্ব সৌন্দর্যে অলংকৃত করিয়াছেন, যাহা প্রত্যক্ষ করিলে মানুষের অন্তর অনিবার্যভাবে নম্র হইয়া আসে। বনানীর সবুজ ছায়া, নদীর প্রবহমান সুর, পাখির কূজন কিংবা নীলাকাশের অসীম বিস্তার-প্রতিটি স্তর যেন এক গভীর সুষমার ভাষা বহন করে। প্রতিটি ফুলের গায়ে এত চমৎকার কারুকাজ-দেখিয়া মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট স্বাভাবিকভাবেই মাথা নত হইয়া আসে। প্রকৃতির এই অপার বিস্ময়কর বিপুল সৌন্দর্যের সম্মুখে দাঁড়াইয়া মানুষ উপলব্ধি করিতে পারে নিজের ক্ষুদ্রতা। আর এই ক্ষুদ্রতার বোধই প্রকৃতপক্ষে তাহাকে মহত্ত্বের দিকে আহ্বান জানায়। কারণ, আত্মজ্ঞান ব্যতীত মহত্ত্বের কোনো ভিত্তি থাকে না। মহাকবি গ্যেটে যথার্থই বলিয়াছিলেন-মানুষ বাহিরে যাহা দেখে, তাহা তাহার অন্তরের প্রতিফলন। হৃদয় যদি কল্যাণে পরিপূর্ণ হয়, তাহা হইলে পৃথিবীও তাহার নিকট এক সুশোভিত উদ্যান বলিয়া প্রতিভাত হইবে।
মানুষের অন্তরে একটি প্রবল আকাঙ্ক্ষা সর্বদাই কাজ করে-সে চাহে ইতিহাসের পাতায় কিংবা মানুষের স্মৃতিতে নিজের চিহ্ন রাখিয়া যাইতে। এক বিখ্যাত বাঙালি মনীষীর ভাষায়-‘জন্মেছিস যখন দাগ রেখে যা।’ কিন্তু এই দাগ বা চিহ্ন কেবল ক্ষমতার প্রদর্শন দ্বারা স্থায়ী হয় না-বরং সুকীর্তির ভিতর দিয়াই তাহা দীর্ঘস্থায়ী হয়। সুকীর্তি মানে মানুষের কল্যাণে নিবেদিত কর্মের সমষ্টি। ইতিহাসের বিস্তৃত প্রান্তরে যাহারা সত্যিকারভাবে স্মরণীয় হইয়া আছেন, তাহারা অধিকাংশই মানুষের কল্যাণের সহিত নিজেদের নিয়তি যুক্ত করিয়াছিলেন; কিন্তু বাস্তব জগৎ আমাদের অন্য এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বস্তুত, ক্ষমতার উষ্ণতা মানুষকে কখনো কখনো এক মায়াজালে আবদ্ধ করে। অথচ ধর্মীয় বা দার্শনিক ঐতিহ্য সর্বদাই এই সত্য স্মরণ করাইয়া দেয়-মানুষের জীবন সীমিত; কিন্তু তাহার কর্মের প্রভাব সীমাহীন হইতে পারে। সমস্যাটি এইখানেই যে, ক্ষমতার মোহ মানুষকে প্রায়শই এই মৌলিক সত্য হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেয়। ইতিহাসের বহু বিপর্যয়, অত্যাচার কিংবা যুদ্ধের মূলেও এই আত্মভ্রম কাজ করিয়াছে-মানুষ ভাবিয়াছে, সে অনন্তকাল অসীম ক্ষমতার ভিতর দিয়াই বাঁচিয়া থাকিবে। অথচ প্রকৃত অমরত্বের ধারণা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইহা ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়িত্বে নহে, বরং মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী স্থান অর্জনের মধ্যে নিহিত। এক শিষ্য যখন গুরুদেবকে প্রশ্ন করিল-অমর হইবার উপায় কী-গুরু উত্তর দিয়াছিলেন- ‘মানুষের উপকার করো, তাহা হইলেই অমরত্ব লাভ করিবে। কারণ, মানুষের হৃদয়ে যাহারা স্থান লাভকরেন, তাহাদের স্মৃতি সময়ের সহিত বিলীন হয় না।’
এই প্রসঙ্গে একটি ছোট্ট নৈতিক কাহিনি উল্লেখযোগ্য। এক ব্যক্তি প্রতিদিন নদীর ধারে দাঁড়াইয়া মৃতপ্রায় মাছগুলিকে পুনরায় জলে ফিরাইয়া দিত। তাহা দেখিয়া একজন বলিল-তুমি তো সকল প্রাণ রক্ষা করিতে পারিবে না, এই সামান্য মাছের প্রাণ রক্ষার কী মূল্য রহিয়াছে? উত্তরে সে বলিল-এই একটি প্রাণ তো বাঁচিল! এই গল্পটি আমাদের স্মরণ করাইয়া দেয় যে, সুকীর্তি বড় কোনো নাটকীয় ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নহে, বরং আমাদের হৃদয়ে এবং মানসিকতার মধ্যে লালন করিতে হয়। ইহার পাশাপাশি, সুকীর্তি মানে আত্মপ্রচার নহে, বরং নিঃস্বার্থ কর্মের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করা। খ্রিষ্টীয় চিন্তাবিদ থমাস ক্যাম্পবেল বলিয়াছিলেন-আমরা যাহাদের হৃদয়ে বাঁচিয়া থাকি, তাহাই প্রকৃত অমরত্ব। এই অমরত্ব কোনো শারীরিক স্থায়িত্ব নহে-ইহা নৈতিক উত্তরাধিকার। সমাজ-রাষ্ট্রের সকলের জন্যই এই শিক্ষা সমানভাবে প্রযোজ্য। যদি আমরা সত্যিই এই ধরণিকে আরো সুন্দর, সহিষ্ণু ও মানবিক করিতে চাই, তাহা হইলে সুকীর্তিকে জীবনের মূল লক্ষ্য করিয়া তুলিতে হইবে। আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি কর্ম যেন মানুষের কল্যাণের সহিত যুক্ত থাকে। কারণ মহাকাল কেবল সেই সকল মানুষকেই স্মরণ রাখে, যাহারা মানবতার পক্ষে দাঁড়াইয়াছিলেন।
অতএব, প্রকৃত অমরত্ব কোনো সিংহাসনে নহে, কোনো সাম্রাজ্যে নহে-ইহা নিহিত থাকে মানুষের হৃদয়ের গভীরে। সুকীর্তিই সেই নীরব অমরত্বের শিখা, যাহা সময়ের অন্ধকার ভেদ করিয়া অনন্তকাল জ্বলিতে থাকে।
