শিক্ষাকার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি প্রসঙ্গে

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:০০

গতকাল ইত্তেফাকের অনলাইনে প্রকাশিত একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল : ‘স্কুলের গেট বন্ধ করে কাঁটাতারের বেড়া, পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষার পর বাড়ি ফিরল শিক্ষার্থীরা'। ঘটনাটি ঘটিয়াছে রাজশাহী জেলার তানোর উপজেলায়। সেইখানকার জুমার পাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের একমাত্র প্রবেশপথে কাঁটাতারের বেড়া দিয়া গেটটি বন্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। ইহাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ের সম্মুখে দাঁড়াইয়া থাকিয়া শেষমেশ আর স্কুলে না যাইতে পারিয়া বাড়ি ফিরিয়া যাইতে বাধ্য হইয়াছে শিক্ষার্থীরা। এমন চিত্র কি আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি একপ্রকার অবমাননা নহে? দীর্ঘ ২৫ বৎসরেরও বেশি সময় ধরিয়া ব্যবহৃত পথটি হঠাৎ করিয়া কেহ কীভাবে নিজের বলিয়া দাবি করিতে পারে? সেইখানে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া ও দোকানঘর নির্মাণের চেষ্টা কেবল আইন অমান্য নহে, বরং ইহা একপ্রকার অমানবিকতাও বটে। সবচাইতে হতাশাজনক বিষয় হইল, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইয়াও ইহার কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারেন নাই।

সরকারি খাসজমি, রেলওয়েসহ সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভূমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি মসজিদ-মন্দিরের জায়গা-জমির উপর লোলুপ দৃষ্টি একশ্রেণির দুষ্টপ্রকৃতির মানুষের যেন মজ্জাগত হইয়া গিয়াছে। বিশেষ করিয়া জমিজমাসংক্রান্ত জটিলতা থাকিতেই পারে; কিন্তু শিক্ষার পরিবেশকে জিম্মি করিয়া ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নহে। আমরা লক্ষ্য করিতেছি যে, দিনদিন জমির মূল্য বৃদ্ধির কারণে আজকাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জায়গাজমি গ্রাস করিয়া লইতেছে স্থানীয় প্রভাবশালী ও ভূমিদস্যরা। ইহাতে তাহাদের বিবেকের কোনো দংশন নাই। অবশ্য অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমির দলিল সংরক্ষণ বা সীমানা নির্ধারণে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা রহিয়াছে, যাহা দখলদারদের জন্য মহাসুযোগ করিয়া দিতেছে। অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনা কোনো ব্যক্তিগত বিবাদের ক্ষেত্র হইতে পারে না। এই জন্য প্রথমত, অবশ্যই নিষ্কণ্টক ও অবিতর্কিত জমিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়িতে হইবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বৈধ জায়গা-সম্পত্তি যাহাতে কেহ দখল করিতে না পারে, সেই জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বদা সজাগ থাকা প্রয়োজন। আলোচ্য ঘটনায় অনতিবিলম্বে ঐ কাঁটাতারের বেড়া অপসারণ করিতে হইবে। প্রয়োজনে আদালতের মাধ্যমে দ্রুত ইনজাংশন জারি করিয়া শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করিতে হইবে। সেইখানে যদি জমির মালিকানা লইয়া প্রকৃতই কোনো প্রকার জটিলতা থাকে, তাহা হইলে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে শিক্ষার্থীদের জন্য স্থায়ী ও নিষ্কণ্টক বিকল্প রাস্তার ব্যবস্থা করা আবশ্যক।

আমরা মনে করি, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমির সীমানা ও মালিকানাসংক্রান্ত তথ্য ডিজিটাল ডাটাবেজের আওতায় আনিতে পারিলে ভবিষ্যতে কেহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমি অবৈধ দখলের দুঃসাহস দেখাইতে পারিবে না। শিক্ষার উপর এমন আঘাত রুখিয়া দিতে স্থানীয় সুধী সমাজ ও অভিভাবকদের সোচ্চার হইতে হইবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তির নহে, ইহা জাতির সম্পদ। আমরা বলি, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। সেই মেরুদণ্ডের উপর কোনো প্রকার আঘাত আসাটা দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত।

আমাদের দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত করিবার আরো নানা অপচেষ্টা ও অপকৌশল পরিলক্ষিত হয়। যেমন—অনেক স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার জায়গাজমি অবৈধভাবে ও জোরপূর্বক ভোগদখল করা হয় বৎসরে পর বৎসর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠ শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য যাহাতে তাহাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ত্বরান্বিত হয়; কিন্তু সেই মাঠে অনেক সময় হাট-বাজার বসানো হয়। সেইখানে গরু-ছাগলও চরিতে দেখা যায়। ইদানীং স্কুল- কলেজ-মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে বিবাহশাদির অনুষ্ঠান আয়োজন করিতেও দেখা যায়। ইহা কাহারও কাম্য হইতে পারে না। মোটকথা, যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক শিক্ষাকার্যক্রমে কোনো প্রকার বাধাবিঘ্ন যাহাতে না আসে, তাহা নিশ্চিত করিতে হইবে।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন