আমাদের সময়ে উচ্চমাধ্যমিকে আমরা 'প্যাট্রিয়ট' নামে একটি অসাধারণ কবিতা পড়েছিলাম। রবার্ট ব্রাউনিংয়ের কবিতা। কবিতাটির শুরু হয় কবির স্মৃতিচারণ দিয়ে। মাত্র পাঁচ বছর আগের কথা। কবি যখন বিজয়ীর বেশে নগরে ফিরেছিলেন, তখন গোটা শহর তাকে বরণ করে নিয়েছিল অভূতপূর্ব উল্লাসে। পথ জুড়ে গোলাপ বিছানো হয়েছিল, মানুষ ঘরের ছাদে উঠে দাঁড়িয়ে ফুল ছুড়ে দিয়েছিল, গির্জার ঘণ্টা বেজেছিল। তার সম্মানে। জনতার ভালোবাসা এত প্রবল ছিল যে, জগতের সব উচ্ছ্বাস যেন তার কাছে তুচ্ছ।
এর পাঁচ বছর পর কী হয়, সে কথা পরে বলা যাবে। তার আগে আমরা রবার্ট ব্রাউনিংয়ের ‘প্যাট্রিয়ট' কবিতার প্রথম অংশের সঙ্গে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন মেলাতে পারি। আজ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিষিক্ত হতে যাওয়ার মুহূর্তটি কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, তারেক রহমানের জন্যও অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি একটি চার রাস্তার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছেন। এই চারটি পথের যে কোনো এক দিকে তিনি পা ফেলতে পারেন। এই চারটি পথ মোটামুটি এভাবে কল্পনা করা যায়—
পথ-১ : সংস্কার ও পুনর্গঠনের পথ। এই পথে তিনি তার সাম্প্রতিক ভাষণের প্রতিশ্রুতিগুলো সত্যি করবেন। প্রতিষ্ঠান শক্ত হবে, আইন সবার জন্য সমান হবে। ইশতেহারের কথা কেবল কথার কথা হবে না। উসকানির বদলে সংযম, প্রতিশোধের বদলে পুনর্নির্মাণ—তার এই ভাষ্য বাস্তবরূপ পাবে। কোনো সাধারণ নেতা নয়, তিনি হবেন স্টেটসম্যান—একজন দূরদর্শী, অভিজ্ঞ, সততা ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন রাষ্ট্রনেতা। এ পথ কঠিন, কারণ এতে নিজের ঘরকেও 'না' বলতে হয়। কিন্তু সফল হলে এটিই তাকে নতুন পরিচয় দেবে। ইতিহাসে তিনি অমরত্ব পাবেন।
পথ-২ : পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যাওয়ার পথ। ক্ষমতা হাতে এলে চারপাশে সুবিধাভোগীরা ভিড় করবে। প্রশংসা বাড়বে, সমালোচনা কমে যাবে। দল-রাষ্ট্রের সীমারেখা ঝাপসা হতে শুরু করবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই পথই সবচেয়ে পরিচিত। ইতিহাস বারবার এই রাস্তায় হেঁটেছে।
পথ-৩ : প্রতিশোধ ও মেরুকরণের পথ। দীর্ঘ নির্যাতন, মামলা, নির্বাসনের স্মৃতি থেকে যদি রাজনীতি চালিত হয়, তাহলে অগ্রাধিকার হয়ে উঠতে পারে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করা। এতে সমর্থকেরা উল্লাস পেতে পারে, কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষ ক্লান্ত ও হতাশ হয়ে পড়বে।
পথ-৪ : প্রত্যাশার ভারে থমকে যাওয়ার পথ। আরেকটি বিপদ আছে—ভুল করার ভয়ে বড় সিদ্ধান্ত না নেওয়া। অতিরিক্ত সতর্কতা, বিলম্ব, অর্ধেক পদক্ষেপ। তাতে কেউ খুব রাগ করবে না, কিন্তু বড় পরিবর্তনও আসবে না।
নেতা টিকে থাকতে পারেন, কিন্তু ইতিহাস তৈরি হয় না।
আজ তারেক রহমান ঠিক এই চার রাস্তার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে। তিনি কোন পথে হাঁটবেন? ক্ষমতার সিঁড়ি তার সামনে, মানুষের প্রত্যাশা তার কাঁধে, আর ইতিহাস তার দিকে তাকিয়ে আছে এক অনড়, নির্মম দৃষ্টিতে। বাংলাদেশ আজ এমন এক প্রভাতে দাঁড়িয়ে, যখন অনেকেই চাইছেন—শুরুটা যেন হয় উল্লাসে, কিন্তু শেষটা যেন ব্রাউনিংয়ের কবিতার সেই মর্মান্তিক পরিণতির মতো না হয়।
ব্রাউনিংয়ের কবিতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে ‘প্যাট্রিয়ট’ হওয়াটার পথটি খুব কঠিন, সেটা রবার্ট দেখিয়ে দেয়। কারণ, কবিতার শেষাংশ ভয়ংকর। পাঁচ বছর আগেও যে মানুষ বিজয়ীর বেশে ফিরেছিল, যার জন্য ছাদে দাঁড়িয়ে ফুল ছুড়েছিল জনতা, ঘণ্টা বেজেছিল—সময়ের স্রোতে তাকেই আবার নিয়ে যাওয়া হয় অপমানের পথে। ফুলের জায়গায় পাথর। উল্লাসের জায়গায় বিদ্রুপ। ব্রাউনিং মানুষের ভালোবাসার ক্ষণস্থায়িত্বের কথা বলেন, জনপ্রিয়তার অনিশ্চয়তার কথা বলেন। মহানায়ক থেকে মহা-অভিযুক্ত হয়ে যাওয়ার ভঙ্গুর দূরত্বের কথা বলেন।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক পরিক্রমা জটিল। এখানে রাজপুত্রের প্রত্যাবর্তন আছে, কিন্তু সঙ্গে আছে অভিযোগ, বিতর্ক, তীব্র দহন, দীর্ঘ নির্বাসন, শারীরিক ভাঙন এবং রাজনৈতিক পুনর্জন্ম। যারা বলেন, কয়লা ধুলেও ময়লা যায় না—তাদের কণ্ঠ এখনো স্তব্ধ হয়নি। আবার যারা বলেন, রত্নাকরও একদিন বাল্মীকি হয়েছিলেন — তাদের চোখেও জ্বলছে আশার আলো। সতেরো সময়কে দীর্ঘ করে? গত বছর ২৫ ডিসেম্বর দেশে বছরের দূরত্ব মানুষকে বদলায় কি? নাকি কেবল ফিরে তিনি বলেছিলেন, 'আই হ্যাভ এ প্ল্যান ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি'। উচ্চারণটি ইচ্ছে করেই ইতিহাসের আরেক প্রতিধ্বনি ছুঁয়ে যায়—মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের 'আই হ্যাভ এ ড্রিম'-এর সঙ্গে। লুথার কিং স্বপ্নের কথা বলেছিলেন—একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের, বৈষম্যহীন ভবিষ্যতের। তার উচ্চারণ ছিল নৈতিক, প্রায় আধ্যাত্মিক। তারেক রহমান পরিকল্পনার কথা বললেন। নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, বিকেন্দ্রীকরণ, প্রবাসী কার্ড, কৃষি কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, কর্মসংস্থান, প্রতিষ্ঠান সংস্কার—একটি প্রশাসনিক এজেন্ডা। গত দেড় মাসে তার ভাষণে একটি বড় পরিবর্তন লক্ষণীয়।
যে মানুষ একসময় ক্ষমতার অন্দরমহলের প্রতীক ছিলেন, যার নামের পাশে 'হাওয়া ভবন' শব্দটি দীর্ঘ ছায়া ফেলেছিল, যিনি গ্রেফকার, রিমান্ড, কারাবাস, নির্যাতন—সব মিলিয়ে এক ভগ্ন শরীর নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমালেন—তিনি ফিরে এসে অন্য ভাষায় কথা বলছেন। তিনি বলছেন, উসকানির মুখে শান্ত থাকতে হবে। তিনি বলছেন, ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। তিনি বলছেন, নাগরিককে দুর্বল রেখে রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। তিনি বলছেন, ক্ষমতায় গেলে প্রথম দিন থেকেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হবে। এমনকি তিনি দুঃখও প্রকাশ করেছেন— অতীতের ‘অনিচ্ছাকৃত' ভুলের জন্য। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতাবানদের মুখে দুঃখপ্রকাশ বিরল দৃশ্য। আরো বিরল, সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা।
তবু লক্ষণীয়—তার বক্তৃতাগুলিতে ক্রমাগত ফিরে আসে কয়েকটি শব্দ : নিরাপত্তা, পরিকল্পনা, অংশগ্রহণ, বিকেন্দ্রীকরণ, তরুণ, নারী, প্রবাসী, কৃষক। যেন তিনি জানেন, অতীতের ইমেজ ভাঙতে হলে ভবিষ্যতের ভাষা চাই।
তিনি কতখানি সহিষ্ণু ও পরিণত রাজনীতিক হয়ে উঠেছেন, তার একটি চমৎকার উদাহরণ আমরা দেখেছিলাম ২০২৪ সালের ১২ আগস্টের ছোট্ট একটি ঘটনায়। তারেক রহমানকে নিয়ে একটি ব্যঙ্গ কার্টুন আঁকেন কার্টুনিস্ট মেহেদি হক। সেদিন এই কার্টুন শেয়ার করে তারেক রহমান লিখেছেন, 'আমি গভীরভাবে আনন্দিত যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক কার্টুন আঁকার স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার হয়েছে...।' তারেকের এ ধরনের অসংখ্য পরিণত বোধের পরিচয় মূলত নিজের ভবিষ্যৎকে পুনর্লিখনের অভিজ্ঞান। তিনি ফিনিক্স পাখির মতো ভস্ম থেকে উঠে আসা মানুষ। কিন্তু ফিনিক্সের পুনর্জন্মের পর এমন পথ বেছে নিতে হয়, যাতে তাকে পুনরায় আগুনে পড়তে না হয়। সুতরাং, এই মুহূর্তে তারেক রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ক্ষমতা কি তাকে বদলাবে, নাকি তিনি ক্ষমতার চরিত্র বদলাতে পারবেন?
ইতিহাস বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয়টি কঠিন। কারণ, ক্ষমতা অতীত-স্মৃতি ঝাপসা করে দেয়। চারপাশে তৈরি হয় প্রশংসার দেওয়াল। সমালোচনা পৌঁছায় না। ভুলগুলো ধীরে ধীরে যুক্তিতে পরিণত হয়, তারপর নিজস্ব নীতিতে। সাধারণ মানুষ হতাশ হয়ে ভাবে—যে যায় লঙ্কায়, সে-ই হয় রাবণ। এই ভয়টি চিরাচরিত।
কিন্তু অন্য ছবিটিও আছে। লন্ডনে বসে দল ধরে রাখা। প্রবীণদের সঙ্গে সমন্বয়। কর্মীদের পাশে থাকার চেষ্টা। মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর দেশে ফিরে প্রকাশ্য জনসভায় দাঁড়িয়ে সংযমের আহ্বান। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার না করে পরিকল্পনার কথা বলা। তিনি ইশতেহারে দারুণ সব কথা উচ্চারণ করেছেন। তবে ইশতেহারকে বহুকাল ধরেই 'বলার জন্য বলা' বলে মনে করা হয়। তিনি যা যা বলেছেন, যদি সত্যিই তা মানেন, তাহলে তাকে ক্ষমতার স্বাভাবিক প্রলোভনের বিরুদ্ধে লড়তে হবে প্রতিদিন। বহু ক্ষেত্রে নিজের দলের কর্মীদের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে হবে।
আমরা আবার ফিরে যাই ব্রাউনিংয়ের প্যাট্রিয়টের ট্র্যাজিক অংশে। সেখানে প্যাট্রিয়টকে জনতার উল্লাস রক্ষা করেনি। জনপ্রিয়তা চিরকালীন নয়, ক্ষমতাও চিরস্থায়ী নয়। আজ, এই অভিষেকের পর মুহূর্ত থেকে তারেক রহমানের প্রতিটি কর্মকাণ্ড, প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি পদক্ষেপ—সব হবে তার আমলনামা। তার এই পুনর্জন্মের সার্থকতা বা ব্যর্থতার খতিয়ান লেখা হতে থাকবে।
মানুষ বদলাতে পারে—এই বিশ্বাস মানবসভ্যতার অন্যতম সুন্দর ধারণা। কিন্তু ক্ষমতা মানুষকে বদলায়—এটিও ততটাই সত্য। এই দুই সত্যের দ্বন্দ্বেই দাঁড়িয়ে আছেন তারেক রহমান। আমরা কি আশা করব? আমরা কি সন্দেহ করব?
দুটোই।
আমরা চাই, তার 'আই হ্যাভ এ প্ল্যান' যেন কেবল বক্তৃতার অলংকার না থাকে। আমরা চাই, তার দুঃখপ্রকাশ যেন কৌশল না হয়ে অনুশোচনা হয়। আমরা চাই, তার নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি যেন দলীয় পরিচয়ে ভাগ না হয়। আমরা চাই, তিনি যেন মনে রাখেন—ব্রাউনিংয়ের কবিতায় নায়ক শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরের বিচারের ওপর ভরসা করেছিল, কারণ মানুষের বিচারে সে হেরে গিয়েছিল।
তারেক রহমানের সামনে সুযোগ আছে— ইতিহাসের মহানায়ক হওয়ার। সতেরো বছরের নির্বাসন যদি তাকে ধৈর্য শিখিয়ে থাকে, তাহলে সেই ধৈর্যই হবে তার শক্তি। যদি নির্যাতন তাকে ক্ষমতার নিষ্ঠুরতা শেখায়, তাহলে সেটিই হতে পারে তার মানবিক নীতি। নইলে রবার্ট ব্রাউনিংয়ের ‘প্যাট্রিয়ট' কবিতাটি তার জন্যও সত্য হয়ে উঠতে পারে। সেই কবিতার মতো নির্মল ‘পুষ্প’সম্ভার সময়ের ব্যবধানে পাথর হয়ে যেতে পারে।
আমরা চাই—এই গল্পের শেষটা যেন প্যাট্রিয়টের মতো না হয়।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক
