গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হইল। এইভাবে দীর্ঘ ১৭ বৎসরের নির্বাসিত জীবন ও কণ্টকাকীর্ণ রাজনৈতিক পথ পাড়ি দিয়া এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এক ভিন্ন প্রেক্ষাপট ও পরিবেশে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তথা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করিলেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তাহার নেতৃত্বাধীন দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আমরা তাহাকে ও তাহার নেতৃত্বাধীন নূতন সরকারকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই।
উল্লেখ্য, পিতা শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও মাতা তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সদ্যপ্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার পর তারেক রহমান সরকার প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক পরিবারের তিন সদস্যের সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালনের এই ঘটনা অনন্য ও নজিরবিহীন। তিনি এমন একসময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করিলেন, যখন তাহার সম্মুখে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ভূরাজনৈতিকসহ নানা চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। বিশেষ করিয়া ভূরাজনৈতিকভাবে দক্ষিণ এশিয়া এক জটিল ও ক্রান্তিকাল অতিবাহিত করিতেছে। এই অঞ্চলের সম্ভাবনাময় একটি দেশ হিসাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখিয়া উন্নয়ন ও অগ্রগতি নিশ্চিত করাই এই মুহূর্তে সবচাইতে জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে।
বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ৫৫(২) ধারায় বলা হইয়াছে, ‘প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তাহার কর্তৃত্বে এই সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রযুক্ত হইবে। আর ৫৬(১) ধারা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী যেইরূপ নির্ধারণ করিবেন, সেইরূপ অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী থাকিবেন।' অর্থাৎ বাংলাদেশ সরকারের ভালোমন্দ ও সফলতা-ব্যর্থতা নির্ভর করে প্রধানমন্ত্রীর উপর। তাই আমরা আশা করি, তিনি নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সহিত এই মহান দায়িত্ব পালন করিবেন এবং বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন করিবেন।
আমরা বহু দিন ধরিয়া বলিয়া আসিতেছি, উন্নয়নশীল দেশসমূহের সার্বিক পশ্চাৎপদতা ও ব্যর্থতার মূল কারণ হইল, এই সকল দেশে জাতীয় নেতার অভাব না থাকিলেও রাষ্ট্রনায়কের (স্টেটসম্যান) রহিয়াছে বড়ই অভাব। একজন জাতীয় নেতা হয়তো একটি নির্দিষ্টসংখ্যক জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করিয়া সাময়িক জনপ্রিয়তা অর্জন করিতে পারেন; কিন্তু একজন রাষ্ট্রনায়ক দূরদর্শী এমন এক জননেতা, যিনি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণ ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের কথা চিন্তা করেন। দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে আত্মনিয়োগ করেন। তারেক রহমান কি তাহার পিতা-মাতার ন্যায় সাফল্য অর্জন করিয়া একজন রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকায় অবতীর্ণ হইতে পারিবেন? আমরা মনেপ্রাণে কামনা করি, বাংলাদেশের নূতন প্রধানমন্ত্রী জনগণের ঐক্য ও সংহতির প্রতীকে পরিণত হউন। সততা, ন্যায়বিচারবোধ, আত্মসংযম, উদারতা ও মহত্ত্বের পরিচয় দিয়া তিনি দেশকে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইতে যথাসাধ্য চেষ্টা করুন। জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনা করিয়া ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম একটি সুস্পষ্ট ভিশন তুলিয়া ধরুন এবং সেই লক্ষ্যে থাকুন অবিচল ও অটল।
আমরা চাই নূতন প্রধানমন্ত্রী দারিদ্র্য, দুর্নীতি, অশিক্ষা এবং রাজনৈতিক অনৈক্য ও অস্থিরতার মতো বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত এই দেশের কান্ডারি হিসাবে আবির্ভূত হউন। তিনি দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করুন, অর্থনৈতিক উন্নয়নে নেতৃত্ব দিন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করুন। তাহার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হউক এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ অন্যান্য জাতিসমূহের সহিত বন্ধুত্ব ও সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপিত হউক, ইহাই আমরা প্রত্যাশা করি। যেইভাবে তিনি শপথ পাঠকালে ঘোষণা দিয়াছেন, সেইভাবে তিনি অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী না হইয়া এবং সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠিয়া বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে কাজ করুন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উপহার দিন একটি ক্রম অগ্রসরমান ও স্থিতিশীল দেশ। আমরা তাহার সার্বিক সাফল্য, সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।
