অন্তহীন সংশয়, সন্দেহ, গুজব মাড়িয়ে একটি নির্বাচনি উৎসব নিশ্চিতে যাবতীয় সহায়তার কথা রাখল সেনাবাহিনী। পূরণ করল অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষতার প্রতিজ্ঞা। কাজটি কি খুব সহজ ছিল? জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেনাবাহিনী ছিল ওয়াদাবদ্ধ। সাদা চোখে দেখা গেছে, সিভিল প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ে যৌথ বাহিনীর সদস্য হয়ে মাঠে থেকেছে সেনাবাহিনী। এবার তাদের কাজের ধরন ছিল একেবারেই আলাদা। হাঁকডাকে মাঠ কাঁপায়নি। নির্বাচনকে ঘিরে জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা পরিকল্পনা ছিল সুনসানে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বেশি কাজ করেছে গোয়েন্দা নজরদারিতে। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের এবারের নির্বাচনি কাজও ইতিহাস হয়ে থাকবে। চব্বিশের জুলাই-আগস্ট পরবর্তীকালে ডিজিএফআই অভ্যন্তরীণভাবে যে কর্মযজ্ঞ চালিয়েছে, তা কেবল সেনাবহিনী বা সরকারকে নয়, দেশকেও সমূহ বিপদ থেকে রক্ষা করেছে।
এবারের নির্বাচনি মাঠেও ছিল প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থাটির কড়া চোখ। তথ্যদৃষ্টে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ছিল তাদের গোয়েন্দা নজরদারি। বিশেষ বিশেষ জায়গায়ও কাজ করেছে তাদের লোক। একটি চক্রের ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল ভোটের আগে ও ভোটের মধ্যে প্রযুক্তিগত গোলমাল বাঁধানোর। এ নিয়ে সরকারের অভ্যন্তরে ছিল গভীর উদ্বেগ। তথ্যটি জানত নির্বাচন কমিশনও। সেটাও বুমেরাং হয়ে গেছে ডিজিএফআইয়ের প্রযুক্তিগত সহায়তায়। তারা প্রকাশ্য নিরাপত্তার চেয়ে গোপনে প্রযুক্তিগত সর্বোচ্চ মাত্রায় সতর্ক ছিল। কথায় নয়, হাঁকডাকে নয়, রাজনৈতিক অলিগলিতেও নয়, পেশাদারিত্বে কাজের মধ্য দিয়ে নতুন এক প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা তৎপরতার অভিষেক ঘটল বাংলাদেশে, যা নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং ভোট সুষ্ঠু করার ক্ষেত্রে কাজ করেছে কোরামিনের মতো।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সেনানিবাস থেকে বের হয়ে মাঠে দায়িত্ব পালন করা শুরু করে সেনাবাহিনী। প্রায় এক বছর ছয় মাস ধরে 'ইন অ্যাইড টু সিভিল পাওয়ার'-এর আওতায় বেসামরিক প্রশাসনকে করেছে সহযোগিতা। ম্যাজেস্ট্রেসি ক্ষমতা থাকার পরও ফ্রন্টলাইনে যায়নি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর যখন সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক ছিল, থানাগুলোর কার্যক্রম বন্ধ এবং পুলিশ যখন নিরাপত্তার অভাবে থানায় যায়নি; ঐ সময় ঢাকাসহ সারা দেশে নৌ ও বিমান বাহিনী, আনসার, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, র্যাবসহ সব বাহিনীর সঙ্গী হয়ে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। নির্বাচনের আগে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনসহ একাধিক সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার, অস্ত্র উদ্ধার, কিশোর গ্যাং গ্রেফতার, বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা, সড়ক আটকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিক্ষোভ করা লোকজনকে বুঝিয়ে রাস্তা থেকে সরিয়েছে একেবারে কুল ডাউনে। ধারণাতীতভাবে এর সুফল মিলেছে ম্যাজিকের মতো। নিশ্চিত হয়েছে সংঘাত ছাড়াই শান্তিপূর্ণ ভোট।
ভোটের দিন সকাল সাড়ে ১০টায় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজকেন্দ্রে ভোট দেওয়ার পর ভোটারদের উদ্দেশে আহ্বান ছিল : 'আপনারা নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিন'। ১২ ফেব্রুয়ারিকে জাতির জীবনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন, আনন্দের দিন মন্তব্য করে বলেছেন, 'আমরা গত দেড় বছর ধরে এ দিনটির অপেক্ষায় ছিলাম। নির্বাচনের আগে সেনাপ্রধান সব পদাতিক ডিভিশনে মিটিং করে নির্বাচন নিয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি সব ইউনিট পরিদর্শন করে সেনা সদস্যদের দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। কাজে লেগেছে সেই সতর্কতা। বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে সতর্ক থাকা জরুরি মনে করেছে ভোটাররাও। নির্বাচনের আগে বুধবার রাত থেকেই সারা দেশের কেন্দ্রগুলোর বাইরে পাহারায় ছিল সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। ভোট শুরুর আগে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনায় তাৎক্ষণিক সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে সমাধান হয়। এবারের নির্বাচনি মাঠে শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভোটকেন্দ্রগুলোতে গড়ে তোলা হয়েছিল কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয়। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় টহল ও তল্লাশি চৌকি বসিয়েও দায়িত্ব পালন করেছেন যৌথ বাহিনীর সদস্যরা। সার্বিক এই নিরাপত্তাব্যবস্থায় মোতায়েন করা হয় সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ১০ লাখ সদস্য। পাশাপাশি এই সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ মাঠে বিশেষ দায়িত্ব পালন করেছেন ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, কোথাও কোনো গোলমাল হলে সবার আগে সেনা সদস্যদের খবর দিয়েছে মানুষ। তারাও দ্রুত এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন।
সেনাবাহিনীর এই দীর্ঘ মিশনের পরিসংখ্যান রীতিমতো চমকপ্রদ। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তারা সারা দেশে অভিযান চালিয়ে ১০ হাজার ১৫২টি অবৈধ অস্ত্র এবং প্রায় ২ লাখ ৯১ হাজার রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে। এছাড়া ২২ হাজার ২৮২ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীকে আটক করে প্রশাসনের হাতে সোপর্দ করেছে। ভোটের দিন কেন্দ্র দখলরোধ, ব্যালট ছিনতাই ঠেকানো এবং সাধারণ ভোটারদের অভয় দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের নিরপেক্ষ ভূমিকা সব মহলে প্রশংসিত হয়েছে। নির্বাচনকে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য করতে ইসিকে যাবতীয় সহযোগিতার অঙ্গীকার ও প্রস্তুতির কথা জানিয়ে রেখেছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। এ-ও বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের দেখানো পথ অনুযায়ী দেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বিভিন্ন মহল থেকে যখন আগামী নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জিং বলা হচ্ছে, তখন সেনাপ্রধানের পরিষ্কার কথা : সেনাবাহিনী যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রশংসা করেছেন জাতীয় নিরাপত্তা, অগ্রগতি, জাতি গঠন এবং সংকটকালে জনগণের পাশে দাঁড়ানোয় সশস্ত্র বাহিনীর। মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বৈশ্বিক শান্তিতে বাহিনীটির অবদানের কথাও।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন অত্যন্ত প্রত্যাশিত। তা চ্যালেঞ্জিংও। সংগত কারণেই এ নিয়ে ব্যাপক সন্দেহ-সংশয় দেখা দেয়। নির্বাচন হবে তো, হলেও সুষ্ঠু হবে তো, অন্তর্বর্তী সরকার পারবে তো—এ ধরনের বহু প্রশ্ন। আকাঙ্ক্ষা বেশি থাকলে প্রশ্ন-সংশয় বেশি থাকাও স্বাভাবিক। টানা ৯ বছর স্বৈরশাসন অবসানের পর '৯১-এর নির্বাচনেও এ ধরনের একটি আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে প্রশ্নও দেখা দিয়েছিল। বিচারপতি শাহাবুদ্দীনের সরকার জনমানুষের সেই প্রত্যাশা মেটাতে পেরেছিলেন সেনা সহায়তায় বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি সুষ্ঠু, অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন নিশ্চিতের মাধ্যমে। সেবারের সঙ্গে এবারের বেশ তফাত। ৯১-তে তিন জোটের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে যে ঐক্য ছিল, তা এবার অনুপস্থিত। সেসময় নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর একে অন্যের বিরুদ্ধে সংঘাত যেমন ছিল না, তেমনি নিজেদের মধ্যে অন্তর্কোন্দলে নেতাকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনাও বিরল ছিল। অন্যদিকে বর্তমানে প্রশাসন, পুলিশসহ সরকারি সব দপ্তরকে দলীয়করণের যে অভিযোগ, সেবার তা ছিল না। এবার সেখানে মারাত্মক বিপত্তি। দৃশ্যমান আরো নানা কারণে এবারের নির্বাচন '৯১- এর নির্বাচনের মতো সরল সমীকরণের বদলে নানা জটিল হিসাব-নিকাশে ভরা। সংগত কারণেই এবার তাই বিশেষ ভরসাস্থলে সশস্ত্র বাহিনী।
আওয়ামী লীগ নির্বাচনি ব্যবস্থাকে কবর দিয়ে গেছে। ফলে এবারের জাতীয় নির্বাচন যেন কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। এ কারণেই কাঙ্ক্ষিত নির্বাচনের পথে সংশয় কেটেও কাটছিল না। গত দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে নির্বাচন মানেই ভয়, দখলদারত্ব, সন্ত্রাস এবং ব্যাপক অনিয়মের স্মৃতি। বিশেষ করে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্বাচনি পরিবেশ এমনভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে, মানুষ নির্বাচনকে আর উৎসব মনে করত না; বরং অনেকেই নির্বাচনের দিন ঘর থেকে বের হতে ভয় পেত। কেন্দ্র দখল, ভোটারদের ভয়ভীতি, বিরোধী প্রার্থীদের ওপর হামলা—এসব যেন নিয়মে পরিণত হয়েছিল। অনিয়ম আর ক্ষমতার দৌরাত্ম্যের পর মানুষ একধরনের মুক্তি অনুভব করলেও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয় ছিল। সেখানে রচনা হলো নতুন ইতিহাস।
• লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট
