বর্তমান বিশ্ব এক চরম অনিশ্চয়তার আবর্তে নিপতিত হইয়াছে। গত শনিবার হইতে ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বিমান হামলার মধ্য দিয়া মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ পুনরায় বারুদের গন্ধে ভারী হইয়া উঠিয়াছে। পেন্টাগন ঘোষিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি' নামক এই সমর-অভিযান কেবল সামরিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ নহে, বরং ইহা এক অতি ব্যয়বহুল ধ্বংসযজ্ঞের মহড়াও বটে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইঙ্গিত অনুসারে, এই যুদ্ধ যদি চার হইতে পাঁচ সপ্তাহকাল স্থায়ী হয়, তাহা হইলে তাহার আর্থিক খতিয়ান হইবে বিপুল ও বিপজ্জনক। তুর্কি সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর তথ্যমতে, অভিযানের প্রথম চব্বিশ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হইয়াছে প্রায় ৭৭ কোটি ৯০ লক্ষ ডলার। ইহার সহিত যুদ্ধের প্রাক্-প্রস্তুতি বাবদ আরও ৬৩ কোটি ডলার ব্যয় করা হইয়াছে। প্রতিদিন কেবল ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড'-এর ন্যায় একটি বিমানবাহী রণতরি পরিচালনায় খরচ হইতেছে প্রায় ৬৫ লক্ষ ডলার। যদি এই যুদ্ধ পাঁচ সপ্তাহব্যাপী চলিতে থাকে, তাহা হইলে রণতরি পরিচালনা, আকাশপথে টহল এবং ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ বাবদ যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় অতি সহজেই সহস্রকোটি ডলারের সীমা অতিক্রম করিবে।
ইতিপূর্বেই ২০২৩ সালের অক্টোবর হইতে ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা প্রদানে মার্কিন করদাতাদের পকেট হইতে প্রায় ৩ হাজার ৩৭৭ কোটি ডলার ব্যয় হইয়াছে। বর্তমান অভিযানে বি-১, বি-২ স্টিলথ ও এফ-৩৫-এর ন্যায় ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমানের ব্যবহার এবং টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের যথেচ্ছ প্রয়োগ এই খরচের অঙ্ককে এক অভাবনীয় উচ্চতায় লইয়া যাইবে। কুয়েতে ইতিমধ্যে তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ধ্বংস হইবার ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই যুদ্ধে সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতিজনিত আর্থিক লোকসানও হইবে বিশাল। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি'-তে আকাশ, সাগর, ভূমি এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা মিলাইয়া ২০টির বেশি অস্ত্রব্যবস্থা মোতায়েন রহিয়াছে। ইহার মধ্যে যুদ্ধবিমান বি-১, বি-২ স্টিল, সর্বাধুনিক এফ-৩৫, এফ-১৫, এফ-১৬ ফ্যালকন ইত্যাদি রহিয়াছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে রহিয়াছে—লুকাস ড্রোন, এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন (নজরদারির জন্য), ভূমি হইতে নিক্ষেপযোগ্য এম ১৪২ হাই মবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম (হিমার্স) ও সাগর হইতে নিক্ষেপযোগ্য টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। রহিয়াছে প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র সুরক্ষাব্যবস্থা ও কাউন্টার ড্রোনব্যবস্থা। মোতায়েন করা হইয়াছে বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এবং ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। সমুদ্রপথে টহল-নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হইতেছে পি-৮ পসেইডন টহল উড়োজাহাজ। যুদ্ধের কাজে ব্যবহারের পণ্য ও রসদ পরিবহনে কাজে লাগানো হইতেছে সি-১৭ গ্লোবমাস্টার, সি-১৮০ হারকিউলিসসহ বিভিন্ন মডেলের উড়োজাহাজ।
পরিতাপের বিষয় এই যে, এই বিপুল সমর-ব্যয়ের চূড়ান্ত দায়ভার শেষপর্যন্ত বিশ্ববাসীর, বিশেষ করিয়া দরিদ্র দেশসমূহের স্কন্ধেই আপতিত হইবে। কেননা মধ্যপ্রাচ্য হইল বিশ্বের জ্বালানি তেলের প্রধান উৎস; ফলে এই অঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি মানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য আকাশচুম্বী হওয়া। ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে তৈলের মূল্য অনিবার্যভাবে বাড়িতে শুরু করিয়াছে। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি শিকল-প্রতিক্রিয়ার (chain reaction) ন্যায় প্রতিটি দেশের পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করিবে, যাহার প্রত্যক্ষ প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাহিরে চলিয়া যাইবে। যুদ্ধের ডামাডোলে অস্ত্র ব্যবসায়ীরা মুনাফা লুটিবে এবং যুদ্ধবাজ নেতৃবৃন্দ ক্ষমতার দাপট দেখাইবে; কিন্তু ইহার যন্ত্রণাদায়ক বলি হইবে বিশ্বের কোটি কোটি সাধারণ নিরপরাধ মানুষ।
প্রকৃতপক্ষে, যুদ্ধে যুদ্ধবাজদের কোনো ব্যক্তিগত ক্ষতি নাই; সকল ক্ষতি ও হাহাকার কেবল সাধারণ বিশ্ববাসীর। অতএব, বিশ্বশান্তি ও মানবতার স্বার্থে এই আত্মঘাতী যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ হওয়া একান্ত প্রয়োজন।
