জলবায়ু পরিবর্তনে নষ্ট হইতেছে কিডনি

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২৬, ০৬:০০

গতকাল ছিল বিশ্ব কিডনি দিবস। কিডনির গুরুত্ব বুঝিতে আমরা একটি বিদেশি গল্প স্মরণ করিতে পারি-অনেক সহস্র বৎসর পূর্বে এক ব্যক্তি দেবদূতের নিকট হইতে এক আশ্চর্য বর লাভ করিয়াছিল। সেই বর ছিল দুইটি অমর কিডনি। দেবদূত বলিয়াছিলেন, এই কিডনি কখনো বিকল হইবে না, কখনো অসুস্থ হইবে না। যত দিন পৃথিবী থাকিবে, তত দিন এই কিডনি তাহাকে জীবিত রাখিবে। কাহিনির সেই ব্যক্তি সহস্রাধিক বৎসর অতিক্রম করিবার পরও সুস্থভাবে বাঁচিয়া রহিয়াছে। গল্পটি নিঃসন্দেহে রূপক; বাস্তব জগতে এমন অলৌকিক বর মানুষের ভাগ্যে জুটিবে না। কিন্তু ইহার অন্তর্নিহিত সত্যটি গভীর-মানবজীবনের সুস্থতা অনেকাংশেই নির্ভর করে কিডনির সুস্থতার উপর।

মানবদেহের এই ছোট অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটি নীরবে প্রতিদিন অসংখ্য কাজ সম্পন্ন করে। কিডনি রক্ত পরিশোধন করে, শরীরের অতিরিক্ত বর্জ্য অপসারণ করে, পানি ও লবণের ভারসাম্য বজায় রাখে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং নানা গুরুত্বপূর্ণ হরমোন উৎপাদনে ভূমিকা রাখে। অথচ এই অঙ্গটি যখন ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হইতে থাকে, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ তাহা বুঝিতে পারে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বলিতেছে, প্রায় ৭০ শতাংশ কার্যক্ষমতা নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কিডনি রোগের লক্ষণ অনেক সময় স্পষ্ট হয় না। ফলে রোগ ধরা পড়িবার সময় অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ইতিমধ্যে জটিল হইয়া যায়।

বর্তমান বিশ্বে কিডনি রোগ একটি ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্যসংকটে পরিণত হইয়াছে। বাংলাদেশে কয়েক কোটি মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত এবং প্রতি বৎসর বিপুলসংখ্যক রোগী ডায়ালাইসিসের প্রয়োজনীয়তার মুখোমুখি হইতেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই সংকটের সঙ্গে আরেকটি নূতন মাত্রা যুক্ত হইয়াছে-তাহা হইল-জলবায়ু পরিবর্তন। দীর্ঘদিন ধরিয়া জলবায়ু পরিবর্তনকে পরিবেশগত সমস্যা বলিয়া বিবেচনা করা হইলেও এখন ক্রমে স্পষ্ট হইতেছে যে, ইহা জনস্বাস্থ্যের উপরও গভীর প্রভাব ফেলিতেছে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাইবার ফলে তাপপ্রবাহের ঘটনা বাড়িতেছে। উচ্চ তাপমাত্রা মানবদেহে পানিশূন্যতা সৃষ্টি করে, যাহা কিডনির উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষত কৃষক, নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক বা খোলা আকাশের নিচে দীর্ঘ সময় শ্রমদানকারী মানুষ এই ঝুঁকির সম্মুখীন হন। পানিশূন্যতা দীর্ঘস্থায়ী হইলে অনেক ক্ষেত্রে আকস্মিক কিডনি বিকল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার কিডনি স্বাস্থ্যের জন্য আরেকটি বিপজ্জনক বাস্তবতা তৈরি করিতেছে। পানিতে অতিরিক্ত লবণ ও দূষিত উপাদান কিডনির উপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলিতে পারে। আবার বন্যা, দূষণ এবং কৃষিক্ষেত্রে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলেও কিডনি রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাইতেছে। এই পরিস্থিতিতে কিডনি রোগের চিকিৎসা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলিতেছে, সচেতনতা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে বহু ক্ষেত্রে কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। পর্যাপ্ত পানি পান করা, অতিরিক্ত লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পরিহার করা, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা-এই সাধারণ অভ্যাসগুলো কিডনি সুস্থ রাখিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

একই সঙ্গে প্রয়োজন নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা। বৎসরে অন্তত এক বার রক্তচাপ, রক্তে শর্করা এবং প্রস্রাব পরীক্ষা করা হইলে প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি সমস্যার অনেকটাই শনাক্ত করা সম্ভব। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়িলে চিকিৎসার মাধ্যমে ইহার অগ্রগতি ধীর করা যায়।

প্রতি বছর বিশ্ব কিডনি দিবস আমাদের একটি মৌলিক সত্য স্মরণ করাইয়া দেয়-মানুষ যত আধুনিকই হউক না কেন, তাহার সুস্থ জীবন শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে দেহের এই নীরব অঙ্গটির উপর। সেই বিদেশি গল্পের মানুষের মতো অমর কিডনি আমাদের ভাগ্যে নাই। অতএব আমাদের দায়িত্ব একটিই-যেই অমূল্য কিডনি আমরা বহন করিতেছি, তাহাকে যত্ন করিয়া রক্ষা করা। কারণ সুস্থ কিডনি ব্যতীত সুস্থ জীবন কেবলই কল্পকথা।

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন