ঈদুল ফিতর আমাদের জাতীয় জীবনে আনন্দ, সম্প্রীতি ও মিলনের এক অনন্য উৎসব। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর এই উৎসব বহিয়া আনে আত্মিক প্রশান্তি ও পারিবারিক মেলবন্ধনের এক অনন্য উপলক্ষ্য: কিন্তু দুঃখজনক সত্য এই যে, প্রতি বছর ঈদ ঘনাইয়া আসিলে দেশের সড়ক-মহাসড়ক, রেলপথ ও নৌপথগুলিতে নামিয়া আসে চরম ভোগান্তি। লাখো-কোটি মানুষ যখন প্রিয়জনের সান্নিধ্যে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করিবার উদ্দেশ্যে রাজধানী বা বৃহৎ শহরগুলি হইতে গ্রামে ফিরিতে উদ্যত হন, তখন অস্বাভাবিক যাত্রীচাপে স্বাভাবিক যাত্রাপ্রবাহ হইয়া উঠে ভোগান্তিপূর্ণ। উৎসবের এই আনন্দযাত্রাকে অনেক সময় ম্লান করিয়া দেয় মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা। মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট, যানবাহনের বেপরোয়া গতি, অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের চলাচল ইহার জন্য দায়ী। ১২ মার্চ বাগেরহাট-মোংলা সড়কে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ১৪টি তাজা প্রাণ ঝড়িয়াছে। উৎসবকালে এইরূপ হতাহত কোনোভাবেই কাম্য হইতে পারে না।
কয়েক বৎসর পূর্বে অবশ্য অবস্থা আরো নাজুক ছিল। বিশেষত, পদ্মা সেতু চালুর পূর্বে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যাতায়াতের প্রধান ভরসা ছিল ফেরিঘাট। ঈদকে সামনে রাখিয়া তখন মাওয়া ও পাটুরিয়া ঘাটে যাত্রী ও যানবাহনের দীর্ঘ সারি সৃষ্টি হইত; অনেক ক্ষেত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনো কখনো-বা দিন পার করিয়াও অপেক্ষা করিতে হইত। সেই দুর্ভোগ ছিল ঈদ যাত্রার এক তিক্ত স্মৃতি। তবে সাম্প্রতিক বৎসরগুলিতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও কানেকটিভিটি এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় তুলনামূলক অগ্রগতির ফলে ঈদ যাত্রা ক্রমশ স্বস্তিদায়ক হইয়া উঠিতেছে। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করিয়া দেয় যে, কার্যকর কর্মপরিকল্পনা এবং সমন্বিত উদ্যোগ থাকিলে পথযাত্রা ভোগান্তিমুক্ত করা সম্ভব; আর সেই জন্য উৎসবকালে সড়ক-মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখিবার স্বার্থে অস্থায়ী ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিতকরণ, দক্ষ চালক নিয়োগ, ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা অত্যাবশ্যক। রেল ও নৌপরিবহন ব্যবস্থাকে কীভাবে উত্তরোত্তর কার্যকর ও যাত্রীবান্ধব করিয়া তোলা যায়, উহাও দৃষ্টিপাতযোগ্য। এই ধরনের উদ্যোগ সড়কপথের উপর হইতে অতিরিক্ত চাপ কিছুটা হইলেও লাঘব করিয়া ভোগান্তিহীন যাত্রা নিশ্চিতে সহায়ক হইবে।
বাস টার্মিনাল, রেল স্টেশন ও লঞ্চঘাটে টিকিটসংক্রান্ত অনিয়ম, দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য এবং অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগের কথা প্রতিবারই শোনা যায়। এই সকল অনিয়ম বন্ধে প্রযুক্তিনির্ভর টিকিটব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিতসহ কঠোর নজরদারির কোনো বিকল্প থাকিতে পারে না। পাশাপাশি যাত্রাপথে শৃঙ্খলা মানিয়া চলা, অতিরিক্ত ভিড় বা ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা পরিহার করা এবং নিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা প্রত্যেকের অবশ্য কর্তব্য। মনে রাখিতে হইবে, নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করিবার ক্ষেত্রে 'ব্যক্তিসচেতনতা' একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
ঈদ আনন্দের, মিলনের এবং মানবিক বন্ধনের উৎসব। এই আনন্দযাত্রা যেন কোনোভাবেই দুর্ভোগ বা শোকের কারণ হইয়া না উঠে, তাহা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং নাগরিক সমাজসহ সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব। প্রতি বৎসর ঈদ উপলক্ষ্যে কোটি মানুষ সড়কে চলাচল করে-ইহা নিঃসন্দেহে ব্যাপক ও বিস্তৃত ব্যবস্থাপনার দাবি রাখে। তবে সময়োপযোগী পরিকল্পনা, কঠোর নজরদারি এবং সর্বোপরি নাগরিক সচেতনতার সমন্বয় ঘটিলে উৎসব যাত্রা নিঃসন্দেহে নিরাপদ ও ভোগান্তিমুক্ত ঈদ যাত্রা নিশ্চিত করা সম্ভব হইবে।
