বিশ্বে বহু দেশ পারিয়াছে, আমাদেরও পারিতে হইবে

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৬, ০৬:০০

একটি রাষ্ট্রের সাফল্য পরিমাপ করিবার বহু সূচক প্রচলিত থাকিলেও, তাহার মধ্যে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য সূচক একটিই—রাষ্ট্রটি তাহার নাগরিকদের, বিশেষত তরুণ জনগোষ্ঠীকে, কতখানি উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করিতে পারিতেছে। কারণ, কর্মহীন জনসংখ্যা কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে ঘাটতি সৃষ্টি করে না—ইহা সমাজের ভেতরে এক নীরব অস্থিরতার জন্ম দেয়, যাহা ক্রমে দৃশ্যমান সংকটে পরিণত হইতে পারে। বাংলাদেশ আজ সেই সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে উপস্থিত। দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী—যাহাকে আমরা গর্বভরে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট' বলিয়া অভিহিত করি—আসলে এক দ্বিমুখী সম্ভাবনা বহন করে। যথাযথ কর্মসংস্থানের মাধ্যমে এই শক্তিকে উৎপাদনশীল ধারায় প্রবাহিত করা গেলে ইহা হইতে পারে অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি; কিন্তু যদি এই জনগোষ্ঠী কর্মহীনতার ঘেরাটোপে আবদ্ধ থাকে, তাহা হইলে ইহাই পরিণত হইতে পারে অস্থিতিশীলতার উৎসে।

এই বাস্তবতাকে সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে স্পষ্ট করিয়া তুলিয়াছেন বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট। তিন দিনের ঢাকা সফর শেষ করিয়া তিনি উল্লেখ করেন, গত এক দশকে বাংলাদেশে প্রায় অর্ধেক কর্মক্ষম তরুণ চাকরি পাইতে ব্যর্থ হইয়াছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, তরুণীদের ক্ষেত্রে এই বঞ্চনা আরও প্রকট। একই সময়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করিয়াছে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ, অথচ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হইয়াছে মাত্র ৮৭ লাখ। এই পরিসংখ্যান নিছক সংখ্যার অমিল নহে—ইহা একটি ক্রমবর্ধমান শূন্যতার প্রতিচ্ছবি, যাহা অর্থনীতি ও সমাজ— উভয়ের ভিতরেই চাপ সৃষ্টি করিতেছে। প্রশ্ন হইল, এই শূন্যতার পরিণতি কী? প্রথমত, দীর্ঘস্থায়ী কর্মহীনতা তরুণদের মানসিক জগতে এক গভীর হতাশা ও অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়। যখন শিক্ষা ও যোগ্যতার পরও কর্মের সুযোগ মিলে না, তখন ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে এক অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়। এই বিচ্ছিন্নতাই অনেক সময় বিপথগামিতার সূচনা করে—অপরাধ, সহিংসতা কিংবা অন্য কোনো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়াইবার প্রবণতা বাড়াইয়া দেয়। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক বাস্তবতা আরও কঠিন। কর্মহীন জনগোষ্ঠী উৎপাদনে অংশগ্রহণ না করিলেও তাহাদের অন্নসংস্থানের প্রয়োজন অব্যাহত থাকে। ফলে, খাদ্য সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের উপর চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাইতে থাকে। একটি পর্যায়ে গিয়া এই চাপ রাষ্ট্রের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ হইয়া উঠিতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে জোহানেস জাটের সতর্কবাণী বিশেষভাবে গুরুত্ববহ। তিনি স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে যেই সকল মৌলিক প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান, তাহা দূর করিবার জন্য দীর্ঘদিনের অপেক্ষমাণ সামষ্টিক অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন অপরিহার্য। ইহা কেবল নীতিগত পরামর্শ নহে; বরং বর্তমান বাস্তবতার এক অবধারিত দাবি। তবে সংস্কার মানেই কেবল নীতিপত্র প্রণয়ন নহে—ইহার প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত থাকে বাস্তবায়নে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য শিল্পায়নের বিস্তার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা প্রদান এবং সর্বোপরি শিক্ষাব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ করিয়া গড়িয়া তোলা—এই সকল বিষয় একযোগে বিবেচনায় আনিতে হইবে। অন্যথায়, ডিগ্রিধারী কিন্তু দক্ষতাহীন এক বৃহৎ জনগোষ্ঠী তৈরি হইতে থাকিবে, যাহারা কর্মসংস্থানের প্রতিযোগিতায় ক্রমাগত পিছাইয়া পড়িবে।

অতএব, আজকের মূল প্রশ্নটি আর কেবল অর্থনৈতিক নহে—ইহা অস্তিত্বগত। বাংলাদেশের এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী কি হইবে উন্নয়নের শক্তি, নাকি অব্যবস্থাপনার ফলে এক অদৃশ্য সংকটের উৎস হইয়া উঠিবে? বিশ্বের বহু দেশ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সফল হইয়াছে, কারণ তাহারা সময়মতো তাহাদের জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে রূপান্তর করিতে পারিয়াছে। বাংলাদেশকেও সঠিক পরিকল্পনায় এই ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট'-এর অমূল্য ফসল ঘরে তুলিতে হইবে। ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—যেই রাষ্ট্র তাহার তরুণদের কর্মে নিয়োজিত করিতে ব্যর্থ হয়, সেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কখনো স্থিতিশীল হয় না। ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট' এক অর্থে তেজস্বী আগুনতুল্য। এই মূল্যবান আগুনের সঠিক ব্যবহার করিতে হইবে, নচেৎ এই আগুনই ধ্বংসাত্মক হইতে পারে।

ইত্তেফাক/এনএন