উৎসব মানুষের জীবনে আনন্দ, মিলন ও প্রশান্তির বার্তা লইয়া আসে; কিন্তু আমাদের সমাজে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দৃশ্যমান—যেই সময় সকল মানুষের মুখে হাসি থাকার কথা, সেই সময়ই কিছু মানুষের জন্য সড়কে রচিত হয় শোকের করুণ কাব্য। ঈদের দিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ২৩ জনের প্রাণহানির ঘটনা এই নির্মম বাস্তবতারই পুনরাবৃত্তি। প্রশ্ন জাগে—এই মৃত্যু কি অনিবার্য, নাকি আমাদের অব্যবস্থাপনা ও উদাসীনতারই ফল?
পরিসংখ্যান বলিতেছে, সড়ক দুর্ঘটনা কোনো আকস্মিক দুর্যোগ নহে, বরং ইহা এক সুস্পষ্ট কাঠামোগত ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশ পুলিশের গবেষণা অনুসারে, মোট দুর্ঘটনার ৪২ শতাংশ ঘটে বেপরোয়া গতির কারণে এবং ২৯ শতাংশ ঘটে সড়কের নাজুক অবস্থার জন্য। দুঃখজনকভাবে ঈদের সময় ফাঁকা সড়কে যেন একপ্রকার ‘অনিয়ন্ত্রিত গতির প্রতিযোগিতা' চলিতে থাকে। বিশেষত মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে বেপরোয়া আচরণ লক্ষণীয়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যে দেখা যায়, সাম্প্রতিক বৎসরগুলিতে ঈদকেন্দ্রিক দুর্ঘটনার উল্লেখযোগ্য অংশই মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট। ২০২২ সালে ১৬৪টি দুর্ঘটনায় ১৪৫ জন নিহত, ২০২৩ সালে ১৬৫ দুর্ঘটনায় ১৬৭ জন নিহত এবং ২০২৫ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩৫ জনে। এই ধারাবাহিকতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নহে; ইহা একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতার ইঙ্গিত বহন করে ।
এই প্রবণতার পেছনে কেবল চালকের দোষ দেখিলে ভুল হইবে । বাস্তবে ইহা একটি বহুমাত্রিক সমস্যা । প্রথমত, অধিকাংশ চালকের জন্য নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নাই । দীর্ঘ সময় গাড়ি চালাইবার ফলে শারীরিক ক্লান্তি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা হ্রাস করে, যাহা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায় । দ্বিতীয়ত, অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত চালকের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে অধিক । তৃতীয়ত, সড়ক অবকাঠামোর দুর্বলতা— যেমন জেব্রাক্রসিংয়ের অভাব, অপর্যাপ্ত সাইনেজ এবং রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি—দুর্ঘটনাকে প্রায় অবধারিত করিয়া তোলে। আইন থাকিলেও তাহার প্রয়োগে দুর্বলতা এই সমস্যাকে আরো জটিল করিয়াছে । সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এ বেপরোয়া চালনায় মৃত্যুর জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বৎসরের কারাদণ্ড বা ৫ লক্ষ টাকা জরিমানার বিধান রহিয়াছে; কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, আইনের ফাঁকফোকর দিয়া অপরাধীরা পার পাইয়া যায় । ফলে শাস্তির ভয় কার্যত অকার্যকর হইয়া পড়ে ।
দুর্ঘটনার প্রভাব কেবল মৃত্যুতেই সীমাবদ্ধ নহে, ইহা বহন করে দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ও মানসিক অভিঘাত। গবেষণায় দেখা গিয়াছে, আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২১ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি আতঙ্কে ভোগে, ১৯ শতাংশ ট্রমায় আক্রান্ত হয় এবং উল্লেখযোগ্য অংশ আত্মবিশ্বাস হারায়। অর্থাৎ, একটি দুর্ঘটনা কেবল একটি ব্যক্তিকে নহে, একটি পরিবারকেও অদৃশ্য সংকটে নিমজ্জিত করে। অন্যদিকে, রেলপথেও একই চিত্র প্রতিফলিত । কুমিল্লার রেলক্রসিংয়ে সাম্প্রতিক দুর্ঘটনায় ১২ জনের মৃত্যু এবং অতীতের ধারাবাহিক দুর্ঘটনাসমূহ দেখাইতেছে—গাফিলতি কেবল সড়কে সীমাবদ্ধ নহে । অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায় চাপানো হয় নিম্নস্তরের কর্মীদের উপর; কিন্তু ব্যবস্থাপনার উচ্চস্তরে জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়িয়া উঠে না । ফলে সমস্যার মূল শিকড় অক্ষতই থাকিয়া যায় ।
এই বাস্তবতায় করণীয় কী? প্রথমত, আইন প্রয়োগে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করিতে হইবে । কেবল আইন প্রণয়ন নহে, তাহার কার্যকর প্রয়োগই মূল চাবিকাঠি । দ্বিতীয়ত, চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণ অপরিহার্য । তৃতীয়ত, সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন— বিশেষত দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করিয়া দ্রুত সংস্কার—অগ্রাধিকার পাইতে হইবে । চতুর্থত, মোটরসাইকেল ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, যেমন আরোহীর সংখ্যা সীমিতকরণ ও মানসম্মত হেলমেট বাধ্যতামূলক করা, বাস্তবায়ন করা জরুরি। তবে এই সকল পদক্ষেপের চাইতেও বড় প্রয়োজন একটি মানসিক পরিবর্তন। সড়ককে আমরা এখনও ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বলিয়া বিবেচনা করি, যেইখানে ‘আগে যাওয়া'-ই যেন আমাদের প্রধান লক্ষ্য । এই মনোভাবের পরিবর্তন না ঘটাইতে পারিলে, কোনো আইন বা অবকাঠামোই দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর হইবে না । অতএব, প্রশ্নটি এখন আর কেবল—দুর্ঘটনা কেন ঘটিতেছে—ইহা নহে। বরং প্রশ্ন হইল, আমরা আর কতকাল ধরিয়া উৎসবের সময়েও দুর্ঘটনার উৎস ও কারণসমূহ বহাল রাখিব?
