অবহেলার মাশুল আর কত?

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২৬, ০৫:০০

২৫ মার্চ দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে সংঘটিত বাস দুর্ঘটনা আমাদের জাতীয় বিবেককে আবারও নাড়া দিয়া গিয়াছে। একটি সাধারণ যাত্রা-যাহা হইবার কথা ছিল স্বস্তির, তাহা মুহূর্তেই পরিণত হইল ট্র্যাজেডিতে। এই বারের ঈদ উৎসবে দেশের অন্যত্র আরো কিছু দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে, যাহাতে হতাহত হইয়াছেন অনেকে।

দৌলতদিয়ার ঘটনার পর স্বভাবতই আবারও প্রশ্ন উঠিতেছে, এইরূপ অবহেলাজনিত মৃত্যুর শেষ কোথায়? কেন উৎসবের মৌসুম, বিশেষত ঈদকে ঘিরিয়া দেশে সড়ক দুর্ঘটনার মিছিল এইভাবে দীর্ঘতর হইয়া উঠিতেছে? ইহার উত্তর খুঁজিতে যাইয়া আমরা দেখিতে পাই, সমস্যার শিকড় বহুমাত্রিক। মূলত অব্যবস্থাপনা, দায়হীনতা ও আইনের দুর্বল প্রয়োগই ইহার কেন্দ্রে অবস্থান করিতেছে। ইহার সহিত অসতর্কতা-অসচেতনতা ও অবহেলা তো রহিয়াছেই। দৌলতদিয়ার ঘটনার ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গিয়াছে, চালক তড়িঘড়ি করিয়া ফেরিতে উঠিতে গিয়াই বাসবোঝাই যাত্রীসমেত পানিতে পড়িয়া যান-এই রকম অস্থির মানসিকতার কারণেই কি সড়ক দুর্ঘটনার পাল্লা ভারী হইতেছে না?

যানবাহন মালিকরা কখনো-বা এমন সকল চালকের হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং তুলিয়া দেন, যাহাদের না ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকে, না যথাযথ প্রশিক্ষণ। এমনকি একজন চালকের বিশ্রাম গ্রহণ কিংবা রুটিন স্বাস্থ্য পরীক্ষার যে বাধ্যবাধকতা রহিয়াছে, তাহাও তোয়াক্কা করা হয় না।

ঈদ উপলক্ষ্যে ঘরমুখী মানুষের চাপ হঠাৎ করিয়া বহু গুণ বৃদ্ধি পায়; আর এই সুযোগে পরিবহন খাতে দানা বাঁধে নৈরাজ্য। ফিটনেসবিহীন যানবাহন রাস্তায় নামানো হয়, অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হয়। ইহার ফলে বিশেষত ফেরিঘাটসহ গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলগুলিতে পরিলক্ষিত হয় শৃঙ্খলার চরম অভাব। যাত্রীদের নিরাপত্তার চাইতে যেন অধিক গুরুত্ব পায় দ্রুত মুনাফা অর্জনের প্রবণতা। ইহার পর কী ঘটে? একটি সামান্য অসতর্কতাই মুহূর্তে প্রাণঘাতী বিপর্যয়ে রূপ নেয়।

সড়ক দুর্ঘটনার পিছনে চালকের একক দোষ-এমন নহে; বরং ইহা একটি সমষ্টিগত ব্যর্থতা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদারকির অভাব, আইন প্রয়োগে শৈথিল্য এবং সর্বোপরি পরিবহন মালিকদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও যাত্রীদের অসচেতনতা-সকল কিছু মিলিয়াই এই দুঃসহ পরিস্থিতির জন্ম দিতেছে। প্রতি বৎসরই আমরা একই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করি, একই শোকবার্তা শুনি: কিন্তু কার্যকর পরিবর্তনের কোনো স্থায়ী উদ্যোগ লক্ষ করি না।

এই মরণদশা হইতে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কঠোর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ। প্রথমত, সড়ক ও নৌপথে চলাচলকারী সকল যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা আবশ্যক। ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করিতে হইবে। দ্বিতীয়ত, চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও কঠোর করিতে হইবে; দৃষ্টি দিতে হইবে তাহাদের স্বাস্থ্যগত দিকেও। তৃতীয়ত, ঈদসহ বিশেষ সময়ে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ মোকাবিলায় সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাহাতে যাত্রীরা নিরাপদ ও শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে গন্তব্যে পৌঁছাইতে পারেন। ইহার পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহকে আরো সক্রিয় ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালন করিতে হইবে। দুর্ঘটনার পর দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হইলে এই অবহেলার সংস্কৃতি কখনোই দূর হইবে না। ইহা অধিকাংশ ক্ষেত্রে 'সরাসরি অবহেলাজনিত মৃত্যু' যা 'হত্যার শামিল'। সুতরাং, এই সম্পর্কে গণসচেতনতা বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। চালক, যানবাহন মালিকদের পাশাপাশি যাত্রীদেরও নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন হইতে হইবে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হইতে হইবে।

সর্বদা মনে রাখিতে হইবে যে, প্রতিটি প্রাণই অমূল্য। অতএব, অবহেলা বা অব্যবস্থাপনার কারণে একটি প্রাণও হারানো গ্রহণযোগ্য নহে। আমরা অবকাঠামোগতভাবে অনেক আগাইয়া গিয়াছি: অগণিত সড়ক-মহাসড়ক, রাস্তাঘাট নির্মাণের মধ্য দিয়া সমগ্র দেশকে কানেকটিভিটির আওতায় আনা হইয়াছে। তথাপি ঈদের আনন্দ যদি এইভাবে শোকে পরিণত হইতে থাকে, তাহা হইলে সেই উন্নয়ন ও অগ্রগতির দাবি অর্থহীন হইয়া পড়িবে। এই ঈদেও সড়ক, রেল ও নৌপথে বহু রক্ত ঝরিয়া গিয়াছে, যাহা নিতান্তই অনাকাঙ্ক্ষিত। এমতাবস্থায় দায়িত্বশীলতা, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার ভিত্তিতে একটি নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে না পারিলে এই প্রশ্ন আমাদের পিছু ছাড়িবে না।

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন