দূষিত নদীর আর্তনাদ কি আমরা শুনিতে পাই?

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:২৯

বাংলার ভূগোল নদীনির্ভর; কিন্তু আজ দেশের বহু নদীই জীবনের উৎস হইতে মৃত্যুর উৎসে পরিণত হইয়াছে। গতকাল মঙ্গলবার ইত্তেফাকে নরসিংদীর নদীগুলি লইয়া প্রকাশিত প্রতিবেদন নদীদূষণের হিমবাহের উপরিভাগের চিত্র মাত্র। প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে নরসিংদীর মেঘনা, শীতলক্ষ্যা, আড়িয়াল খাঁ, হাঁড়িধোয়া কিংবা ব্রহ্মপুত্র—যেই সকল নদনদী একদা জীবন, বাণিজ্য ও জীবিকার প্রাণস্পন্দন ছিল, আজ তাহারাই বিষাক্ত প্রবাহে পরিণত হইয়াছে। এই নদীগুলি এখন জনজীবন ও পরিবেশের জন্য এক নীরব বিপর্যয়ের কারণ হইয়া উঠিয়াছে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, এই চিত্র কেবল নরসিংদীতেই সীমাবদ্ধ নহে, ইহা সমগ্র বাংলাদেশের নদীব্যবস্থার এক উদ্বেগজনক প্রতিচ্ছবি।

একসময় এই নদীপথেই বৃহৎ জাহাজ চলিত, পালতোলা নৌকায় ব্যবসায়ী আসিতেন, নদীতীর ছিল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র; কিন্তু শিল্পায়নের অব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ এবং পরিবেশগত শৃঙ্খলার অভাবে আজ সেই নদীগুলি সংকুচিত, দূষিত ও প্রাণহীন। প্রতিবেদনে প্রকাশ পাইয়াছে, কলকারখানার বিষাক্ত কেমিক্যাল সরাসরি পাইপযোগে নদীতে নিঃসৃত হইতেছে। ফলে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা এতটাই হ্রাস পাইয়াছে যে, জলজপ্রাণী বাঁচিবার ন্যূনতম পরিবেশটুকুও আর অবশিষ্ট নাই। গবেষণায় হাঁড়িধোয়া নদীতে অক্সিজেনের পরিমাণ মাত্র শূন্য দশমিক ছয়—যাহা প্রকৃতপক্ষে এক মৃতপ্রায় নদীর পরিচায়ক। ইহা কেবল পরিবেশগত বিপর্যয় নহে, ইহা মানবস্বাস্থ্যের প্রতিও সরাসরি হুমকি।

এই একই দৃশ্য দেশের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন নদীগুলিতেও প্রতিনিয়ত প্রতিফলিত হইতেছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু কিংবা কর্ণফুলী—প্রায় সর্বত্রই শিল্পবর্জ্য, ট্যানারি বর্জ্য, রং ও রাসায়নিক পদার্থের নির্বিচার নিঃসারণ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও প্রাণশক্তিকে নিঃশেষ করিতেছে। কোথাও পানি কালো, কোথাও তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত, আবার কোথাও নদীর তলদেশ পর্যন্ত মৃতপ্রায়। অর্থাৎ নরসিংদীর নদীগুলি যাহা ভোগ করিতেছে, তাহা আসলে একটি বৃহত্তর জাতীয় সংকটের অংশমাত্র। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—উন্নয়ন কি কেবল শিল্পকারখানার সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি তাহার সহিত পরিবেশগত ভারসাম্যও সমানভাবে রক্ষিত হওয়া উচিত? যে উন্নয়ন নদীকে হত্যা করে, যে অগ্রগতি মানুষের পানিকে বিষাক্ত করে তোলে, তাহা প্রকৃতপক্ষে উন্নয়ন নহে—তাহা এক প্রকার আত্মঘাতী প্রবণতা। কারণ নদী ধ্বংস মানেই কৃষি, মৎস্য, জনস্বাস্থ্য ও বাস্তুতন্ত্রের উপর সম্মিলিত আঘাত। শীতলক্ষ্যা নদীর সাম্প্রতিক অবস্থাও একই সতর্কবার্তা প্ৰদান করিতেছে।

এইখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান–আইন ও নীতিমালার অভাব নহে, বরং তাহার যথাযথ প্রয়োগের অভাবই প্রধান সমস্যা। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, নদী রক্ষা কমিশন, পরিবেশ অধিদপ্তর—সকলই বিদ্যমান; কিন্তু কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাবে দূষণকারীরা প্রায়শই দায়মুক্তি পাইয়া যায়। নদীকে বর্জ্য নিষ্কাশনের সহজ মাধ্যম বলিয়া বিবেচনা করা যেন এক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত হইয়াছে। সরকারের পক্ষ হইতে হাঁড়িধোয়া নদীর দূষণ রোধে অর্থ বরাদ্দের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক; কিন্তু কেবল বরাদ্দ প্রদানই সমাধান নহে— প্রয়োজন স্বচ্ছ বাস্তবায়ন, সময়োপযোগী পদক্ষেপ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয়। এক বৎসর অতিবাহিত হইলেও যদি বরাদ্দকৃত অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহার না হয়, তাহা হইলে তাহা সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে প্রশাসনিক জটিলতার আরেকটি উদাহরণে পরিণত হয়।

এই ক্ষেত্রে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার, বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন ও কার্যকর রাখা—ইহা কেবল আইনগত বাধ্যবাধকতা নহে, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতা। উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে একটি সুসমন্বিত সম্পর্ক গড়িয়া তুলিতে হইবে, যেইখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রকৃতির বিনাশের বিনিময়ে অর্জিত হইবে না। সর্বোপরি, নদীকে কেবল ভৌগোলিক সত্তা হিসেবে নহে, বরং একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্ৰ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। নদী বাঁচিলে দেশ বাঁচিবে—এই সত্যটি যতদিন আমাদের নীতি, পরিকল্পনা ও আচরণে প্রতিফলিত না হইবে, ততদিন এই সংকটের অবসান ঘটিবে না। নরসিংদীর নদীগুলি আজ যে আর্তনাদ করিতেছে, তাহা কেবল একটি অঞ্চলের আর্তনাদ নহে—ইহা সমগ্র বাংলাদেশের নদীগুলিরই সম্মিলিত আর্তনাদ।

ইত্তেফাক/এনএন