যুদ্ধ নয় শান্তি : ধ্বংসের বিরুদ্ধে মানবতার আহ্বান

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪০


মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত দুই ধারায় প্রবাহিত—একদিকে সৃষ্টি, অন্যদিকে ধ্বংস। সভ্যতা যত এগিয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞান যত উন্নত হয়েছে, ততই মানুষ উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে; আবার সেই মানুষই বারবার যুদ্ধের মাধ্যমে ধ্বংস ডেকে এনেছে। প্রশ্ন জাগে—এই যুদ্ধের চক্র থেকে কি মুক্তি নেই? শান্তি কি কেবলই এক কল্পনা? বাস্তবতা হলো, যুদ্ধ কখনোই হঠাৎ করে শুরু হয় না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের জমে থাকা অবিশ্বাস, স্বার্থের সংঘাত, ক্ষমতার লড়াই এবং নিরাপত্তাহীনতা। কোনো দেশ তার আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, কোনো দেশ নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় লড়ে, আবার কোথাও ধর্ম, জাতি বা সীমান্ত নিয়ে বিরোধ সংঘাতে রূপ নেয়। এসব কারণ একসময় বিস্ফোরিত হয়ে যুদ্ধের জন্ম দেয়।

প্রাণহানি, রক্তপাত, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, শরণার্থী সংকট, সামাজিক ভাঙন—এসবই যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মানবসভ্যতা এত যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও এখনো সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ট্রোজান যুদ্ধ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের ক্রুসেড — প্রতিটি সংঘাতের পেছনে ছিল ভিন্ন ভিন্ন কারণ, কিন্তু পরিণতি ছিল একই। আধুনিক যুগে এসে যুদ্ধ আরো ভয়াবহ রূপ নেয়, যখন প্রযুক্তি ও অস্ত্রশক্তি এক নতুন মাত্রা পায়।

বিশ্ব ইতিহাসে প্রথম বড় ধাক্কা আসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে বিশ্ব বিভক্ত হয়ে পড়ে দুই শিবিরে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র একদিকে আর জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও অটোমান সাম্রাজ্য অন্যদিকে। কিন্তু সেই বিপর্যয় ছিল কেবল একটি পূর্বাভাস। মাত্র দুই দশক পরই শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ—মানব ইতিহাসের সবচেয়ে
ভয়াবহ সংঘাত। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে মিত্রশক্তি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন এবং অক্ষশক্তি জার্মানি, ইতালি, জাপান মুখোমুখি হয়। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ প্রাণ হারায় এবং ২ কোটির বেশি মানুষ আহত হয়। অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল প্রায় ২০৮ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যেখানে ৭ থেকে ৮.৫ কোটি মানুষ নিহত হয়—যা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণবিধ্বংসী ঘটনা। এর ক্ষয়ক্ষতি পৌঁছে যায় ৪ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে।

যুদ্ধের ধরন ও প্রকৃতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে। তলোয়ার থেকে পারমাণবিক অস্ত্র, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সাইবার ওয়ার। যে কারণ হোক না কেন, যুদ্ধের ফলাফল সব সময়ই ধ্বংসাত্মক।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মাত্র ৯ মাসে সরকারি হিসেবে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ নিহত হন। কয়েক লাখ মানুষ আহত হন, আর ২ লাখ নারী নির্যাতনের শিকার হন। প্রায় ১ কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। নেপোলিয়নিক যুদ্ধ (১৮০৩-১৮১৫) যুদ্ধ ছিল এক দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত, যা প্রায় পুরো ইউরোপকে গ্রাস করেছিল। এই যুদ্ধে আনুমানিক ৩৫ লাখ থেকে ৬০ লাখ মানুষ নিহত হয়। আহতের সংখ্যা কয়েক মিলিয়ন। ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্রও এই যুদ্ধের ফলে আমূল পরিবর্তিত হয়। আমেরিকার গৃহযুদ্ধ (১৮৬১- ১৮৬৫) যুক্তরাষ্ট্রের ভিতরেই ভয়াবহ বিভাজন তৈরি করে। এ যুদ্ধে নিহত প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার, আহত ১০ লাখ। আনুমানিক ক্ষতি তখনকার সময় ৬ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলার। ভিয়েতনাম যুদ্ধ (১৯৫৫-১৯৭৫) আধুনিক যুদ্ধের নির্মমতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের একটি ভয়াবহ উদাহরণ। প্রায় ২০ থেকে ৩০ লাখ মানুষ নিহত হয়, যার বড় অংশই বেসামরিক নাগরিক। এই যুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র, বিশেষ করে Agent Orange-এর ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনে। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ শত শত বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে
যায়।

ইরান-ইরাক যুদ্ধ (১৯৮০-১৯৮৮) আট বছরব্যাপী স্থায়ী হয়। এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম রক্তক্ষয়ী সংঘাত। আনুমানিক ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ মানুষ নিহত হয় এবং ১০ লাখেরও বেশি আহত হয়। উভয় দেশের তেল স্থাপনা, শহর ও অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৫০০ থেকে ১ হাজার বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়। এই যুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাও বিশ্বকে নাড়া দেয়। কোরিয়ান যুদ্ধে (১৯৫০-১৯৫৩) প্রায় ২৫ লাখ প্রাণহানি ঘটে। আফগান যুদ্ধে (১৯৭৯- ২০২১) প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার। সিরিয়া গৃহযুদ্ধে (২০১১- চলমান) ৫ লাখের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং ১ কোটির বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বর্তমানে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতি ইতিমধ্যে ৫০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ (গাজা যুদ্ধ, ২০২০-২০২৬) মোট প্রাণহানি ফিলিস্তিনি নিহত ৭০ হাজার ৭৫ হাজার ইসরায়েলি নিহত ২ হাজারের বেশি।

বর্তমান ইরান বনাম ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ চলমান। নিহত ও আহতের সংখ্যা গণনার সময় এখনো আসেনি। এই সব যুদ্ধের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—যুদ্ধ কেবল সামরিক শক্তির লড়াই নয়; এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল, যার মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ। যুদ্ধের ময়দানে সৈন্যরা লড়াই করলেও, এর প্রভাব পড়ে ঘরে ঘরে—মা হারায় সন্তান, সন্তান হারায় পিতা, আর সমাজ হারায় তার স্থিতি। আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তির উন্নতির ফলে যুদ্ধের ধ্বংসক্ষমতা আরো বেড়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র, ড্রোন, সাইবার যুদ্ধ—সবকিছু মিলিয়ে একটি যুদ্ধ এখন পুরো মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি। আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ এখন আর শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, জোট রাজনীতি এবং অস্ত্র ব্যবসা।

যখনই কোনো যুদ্ধ শুরু হয়, তখনই দুটি ভিন্ন কণ্ঠ একসঙ্গে উচ্চারিত হয়। উভয়পক্ষই নিজেদের ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো বলে দাবি করে। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দেয়, আর অন্য পক্ষ নিজেকে স্বাধীনতার সংগ্রামী হিসেবে তুলে ধরে। এই দ্বৈত বাস্তবতা মানবসভ্যতার ইতিহাসে নতুন কিছু নয়, বরং যুগে যুগে যুদ্ধের সঙ্গে এই বিতর্ক অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যুদ্ধের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন চিরন্তন। কে ন্যায়ের পক্ষে, কে অন্যায়ের বিপক্ষে—এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। কারণ ইতিহাস বলে, একই যুদ্ধকে এক পক্ষ দেখে ‘স্বাধীনতার লড়াই' হিসেবে অন্য পক্ষ দেখে বিদ্রোহী দমন হিসেবে, কেউ বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসাবে। দৃষ্টিভঙ্গির এই পার্থক্যই যুদ্ধকে জটিল করে তোলে। তবে একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই—পৃথিবীর বহু দেশ যুদ্ধের মাধ্যমেই স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ১৯৭১ সালে ৯ মাসব্যাপী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র ১৮শ শতকে (১৭৭৫ - ১৭৮৩) ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা লাভ করে। ভিয়েতনাম একাধিক শক্তির বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন সময় যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করে। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ৯ বছর (১৯৪৬-১৯৫৪) ও আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ২০ বছর (১৯৫৫-১৯৭৫) আলজেরিয়া দীর্ঘ আট বছর (১৯৫৪-১৯৬২) রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ফরাসি শাসন থেকে মুক্ত হয়। অ্যাঙ্গোলা ১৪ বছর (১৯৬১-১৯৭৫) পর্তুগালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করে। মোজাম্বিক ১০ বছর (১৯৬৪- ১৯৭৪) পর্তুগালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করে। এসব উদাহরণ দেখায়, স্বাধীনতা অনেক সময় বিনা সংগ্রামে আসে না; বরং তা অর্জন করতে হয় ত্যাগ, রক্ত ও প্রতিরোধের মাধ্যমে। এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—সব যুদ্ধ কি ন্যায়সংগত? সব বিদ্রোহ কি স্বাধীনতার সংগ্রাম? সব যুদ্ধ কি বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। উত্তরটি সহজ নয়। অনেক ক্ষেত্রে 'স্বাধীনতার লড়াই' নামে ক্ষমতা দখলের রাজনীতি চলে, আবার অনেক সময় 'বিদ্রোহ দমনে'র নামে ন্যায়সংগত দাবিকেও দমন করা হয়।

যুদ্ধে যে পক্ষ বিজয়ী হয়, অনেক সময় তারাই নিজেদের বর্ণনাকে 'সত্য' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। অবশ্য সব দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। স্বাধীনতার সংগ্রাম মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের জন্য লড়াই। যখন একটি জাতি তার ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তখন সেই জাতির প্রতিরোধ অনেক সময় যুদ্ধের রূপ নেয়। এই প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার যুদ্ধকে কেবল সহিংসতা হিসেবে দেখলে তার গভীরতা বোঝা যায় না।

যুদ্ধের ইতিহাস আমাদের এক জটিল শিক্ষা দেয়—ন্যায় ও অন্যায় সব সময় স্পষ্টভাবে আলাদা করা যায় না। তবে মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসকে এগিয়ে নিয়ে যায়। পারমাণবিক অস্ত্রের যুগে যুদ্ধ মানে শুধু একটি দেশের ধ্বংস নয়, পুরো মানবজাতির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়া। তাই যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা নয়, বরং যুদ্ধ এড়ানোর উপায় খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

যুদ্ধ শুরু করা যত সহজ, বন্ধ করা তত কঠিন। কারণ একবার সংঘাত শুরু হলে এতে জড়িয়ে পড়ে জাতীয় মর্যাদা, প্রতিশোধের মনোভাব এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। যখন কোনো রাষ্ট্র যুদ্ধরত অবস্থায় থাকে, তখন আপস বা সমঝোতাকে অনেক সময় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। ফলে নেতৃত্বও কঠোর অবস্থানে থাকে। যুদ্ধ যেমন মানুষের সৃষ্টি, তেমনি শান্তিও মানুষের হাতেই গড়া সম্ভব।
শান্তির প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো সংলাপ। গুলি চালানোর আগে যদি কথা বলা যায়, অনেক রক্তপাত এড়ানো সম্ভব। ইতিহাসে দেখা গেছে, অনেক বড় সংঘাত শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে অন্যায়ের বিচার হয় না, সেখানে ক্ষোভ জমতে থাকে, আর সেই ক্ষোভ একসময় সহিংসতায় রূপ নেয়। একটি টেকসই শান্তির জন্য দরকার এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে শক্তিশালী ও দুর্বল সবার জন্য সমান বিচার নিশ্চিত হয়।

অর্থনৈতিক সহযোগিতাও শান্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। যে দেশগুলো পরস্পরের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে জড়িত, তারা সহজে যুদ্ধের পথে হাঁটে না। কারণ যুদ্ধ মানেই অর্থনৈতিক ক্ষতি, উন্নয়নের বাধা। তাই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা শান্তিকে শক্তিশালী করে। শিক্ষা ও সচেতনতা এই প্রক্রিয়াকে আরো গভীর করে। ঘৃণা, বিদ্বেষ ও বিভাজনের বীজ অনেক সময় ছড়ানো হয় ভুল তথ্য ও বিকৃত ইতিহাসের মাধ্যমে। একটি সহনশীল, মানবিক শিক্ষা মানুষকে যুদ্ধের মানসিকতা থেকে দূরে রাখে এবং অন্যকে সম্মান করতে শেখায়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় নেতাদের স্বল্পমেয়াদি স্বার্থ, জনপ্রিয়তা বা ক্ষমতার লড়াই জনগণকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। দায়িত্বশীল নেতৃত্বের কাজ হলো উত্তেজনা বাড়ানো নয়, বরং তা নিয়ন্ত্রণ করা এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোঁজা।

দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রচার, গুজব বা উসকানিমূলক বক্তব্য যুদ্ধের আগুনকে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে। আবার সঠিক তথ্য ও শান্তির বার্তা মানুষকে সংঘাত থেকে দূরে রাখতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো — মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। যখন আমরা অন্যকে ‘শত্রু' হিসেবে দেখি, তখন যুদ্ধ সহজ হয়ে যায়। কিন্তু যখন আমরা অন্যকে একজন মানুষ হিসেবে দেখি, যারও পরিবার আছে, স্বপ্ন আছে, বেঁচে থাকার অধিকার আছে—তখন যুদ্ধের ইচ্ছা কমে যায়। শান্তি মানে শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়; শান্তি মানে ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা, সম্মান ও সমান সুযোগ। এই উপাদানগুলো ছাড়া শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। অতএব, যুদ্ধ থেকে মুক্তির পথ একক নয়। এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া। সংলাপ, ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, শিক্ষা, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সবকিছু মিলেই শান্তির ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব।

সব বিদ্রোহ কি স্বাধীনতার সংগ্রাম? সব যুদ্ধ কি বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। উত্তরটি সহজ নয়। অনেক ক্ষেত্রে ‘স্বাধীনতার লড়াই’ নামে ক্ষমতা দখলের রাজনীতি চলে, আবার অনেক সময় ‘বিদ্ৰোহ দমনে'র নামে ন্যায়সংগত দাবিকেও দমন করা হয়

ইতিহাস প্রমাণ করে যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত সমাধান হয় আলোচনার টেবিলেই। সরাসরি সংলাপ কঠিন হলেও, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পরোক্ষ আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। ‘ব্যাক-চ্যানেল ডিপ্লোমেসি' অনেক সময় আনুষ্ঠানিক আলোচনার চেয়েও কার্যকর হয়। দুই পক্ষের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। এর জন্য কিছু বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। সীমিত সময়ের জন্য যুদ্ধবিরতি, বেসামরিক জনগণের ওপর হামলা বন্ধ, মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা, বন্দি বিনিময়। এই ধরনের ছোট ছোট পদক্ষেপ বড় সমাধানের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। যুদ্ধ বন্ধে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো যদি সমন্বিতভাবে শান্তির পক্ষে অবস্থান নেয়, তাহলে সংঘাত দ্রুত বন্ধ করা সম্ভব।
যুদ্ধে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা। এই মানবিক দিকটি সামনে এনে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করলে যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা বাড়ে।

যুদ্ধ কারো জন্যই লাভজনক নয়। যুদ্ধ কখনো কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না। এটি শুধু ধ্বংস, মানবিক বিপর্যয় ও প্রতিশোধের চক্র সৃষ্টি করে। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ক্ষতবিক্ষত করে। আজকের বিশ্বে যখন বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাতের আগুন জ্বলছে, তখন অতীতের যুদ্ধগুলোর ধ্বংসলীলা ও ক্ষতির পরিমাণ আমাদের সতর্ক করে দেয় উন্নয়ন, শান্তি ও সহাবস্থানের পথই হতে পারে মানবতার টিকে থাকার একমাত্র উপায়। কারণ, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের বিজয়ী কেউ নয়—পরাজিত হয় পুরো মানবসভ্যতা।

লেখক : ফিকামলি তত্ত্বের জনক, বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ইত্তেফাক/এনএন