তৃতীয় বিশ্বের দুঃখ যেইখানে

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:০০

একটি দেশ বা ভূখণ্ডের প্রকৃত সম্পদ তাহার মাটি, নদী বা খনিজ নহে-তাহার মানুষ। কারণ মাটি নিঃশব্দ, খনিজ নিষ্ক্রিয়: কিন্তু মানুষই একমাত্র সত্তা, যাহা চিন্তা করে, সৃজন করে, ভুল করে এবং পুনরায় সংশোধন করিয়া উন্নতির পথে অগ্রসর হইতে পারে। অতএব, যেই জাতি তাহার মানুষকে গড়িতে পারে, সেই জাতিই ইতিহাসের প্রবাহে সুস্পষ্ট ছাপ রাখিতে সক্ষম হয়। ইহা সর্বজনবিদিত যে, বহু রাষ্ট্র প্রাকৃতিক সম্পদের দিক হইতে দারিদ্র্যগ্রস্ত হইলেও মানবসম্পদের উৎকর্ষ দ্বারা বিশ্বে মর্যাদার আসন লাভ করিয়াছে। অপরদিকে, বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও যেই সকল দেশ মানুষের বিকাশে অবহেলা করিয়াছে, তাহারা উন্নয়নের পথে বারংবার ব্যর্থ হইয়াছে।

মানবসম্পদ কোনো আকস্মিক সৃষ্ট বস্তু নহে-ইহা এক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিবিড় পরিচর্যা ও সুসংহত ব্যবস্থাপনার ফল। একটি শিশু জন্মগ্রহণ করিবার পর হইতেই তাহার শারীরিক, মানসিক, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়ে প্রয়োজন, উন্নত বিশ্ব সেই দায়ভার যথার্থভাবে গ্রহণ করিয়াছে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় নীতি-সকলই যেন এক অদৃশ্য সুতোয় গাঁথা, যাহার লক্ষ্য একটিই একটি সুগঠিত, সুশৃঙ্খল ও সৃজনশীল নাগরিক গড়ে তোলা। কারণ, আজকের শিশুই আগামীর রাষ্ট্রনায়ক, চিন্তাবিদ, নীতিনির্ধারক। একটি শিশুর জন্মের পর হইতেই তাহার দেহ, মন, বুদ্ধি ও নৈতিক বোধ-এই চারটি স্তম্ভের উপর সমান গুরুত্ব আরোপ করিতে হয়। যদি কোনো একটি স্তম্ভ দুর্বল হয়, তাহা হইলে সমগ্র ব্যক্তিত্বই বিপর্যস্ত হইয়া পড়ে। এইখানেই রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব অনস্বীকার্য।

বস্তুত, একটি দেশ একখানি অনাবাদি জমির ন্যায়। সেই জমিকে কর্ষণ করিতে হয়, বীজতলা প্রস্তুত করিতে হয়, উপযুক্ত বীজ নির্বাচন করিয়া যথাসময়ে বপন করিতে হয়। তাহার পর প্রয়োজন নিয়মিত সেচ, সার প্রয়োগ, আগাছা দমন ও সযত্ন পরিচর্যা। এই প্রতিটি ধাপ যদি যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়, তবেই ফলন হইবে সমৃদ্ধ। মানবসম্পদের ক্ষেত্রেও ইহাই সত্য। একটি শিশুর জন্ম হইতে কৈশোর, কৈশোর হইতে যৌবন-প্রতিটি স্তরে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও যত্ন অপরিহার্য। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তৃতীয় বিশ্বের বহু রাষ্ট্রে এই মৌলিক সত্য উপেক্ষিত। শিক্ষাব্যবস্থা প্রায়শই মানহীন, স্বাস্থ্যসেবা অপ্রতুল, নৈতিক শিক্ষার অভাব প্রকট। ফলে মানবজমিনে আগাছার বিস্তার ঘটে, সুশস্যের চারা গজাইলেও তাহা টিকিয়া থাকিতে পারে না। কিছু প্রতিভা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিকশিত হইলেও সামগ্রিক জাতিগত উৎকর্ষ অর্জিত হয় না। এই কারণেই বহু দেশ স্বাধীনতার বহু দশক পরও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌঁছাইতে ব্যর্থ হইয়াছে।

অনেকে এই ব্যর্থতার কারণ হিসাবে জাতিগত বৈশিষ্ট্য বা তথাকথিত ‘জেনেটিক সীমাবদ্ধতা’র কথা উল্লেখ করেন। কিন্তু এই যুক্তি আংশিক ও বিভ্রান্তিকর। একই নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর অন্তর্গত হইয়াও মিয়ানমার উন্নয়নের দিক হইতে অনেক পিছাইয়া আছে, যেইখানে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা সিংগাপুর অগ্রসর হইয়াছে বহুগুণে। ইহা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি জিনগত নহে বরং নীতি, পরিকল্পনা ও শাসনব্যবস্থার গুণমান। অতএব, একটি দেশের ভাগ্য নির্ধারিত হয় তাহার পরিকল্পনাকারী ও নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতা দ্বারা। সুদূরপ্রসারী চিন্তা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও অবিচল রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকিলে মানবসম্পদকে সোনালি শস্যে পরিণত করা সম্ভব। পৃথিবীর বহু রাষ্ট্র আছে, যাহাদের ভূমি উর্বর নহে, খনিজ সম্পদ সীমিত, তথাপি তাহারা উন্নয়নের শীর্ষে আরোহণ করিয়াছে কেবল মানবসম্পদের উৎকর্ষের বলেই। জাপান এই সত্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। সমানভাবে জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ফিনল্যান্ড-এই সকল রাষ্ট্র প্রমাণ করিয়াছে, মানুষের মান উন্নত হইলে জাতির মান স্বয়ংক্রিয়ভাবে উন্নীত হইয়া থাকে।

এই প্রসঙ্গে রামপ্রসাদের একটি প্রখ্যাত গান রহিয়াছে-‘এমন মানবজমিন রইল পতিত, আবাদ করলে ফলত সোনা’। এই পঙক্তি রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও উন্নয়ন অর্থনীতিরও এক গভীর উপমা। মানবজমিনকে পতিত রাখিয়া উন্নয়ন সাধন অসম্ভব ব্যাপার। তৃতীয় বিশ্বের দুঃখ সেইখানেই।

ইত্তেফাক/এমএস

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন