বিশ্বমানবতার ইতিহাসে যুদ্ধ নূতন নহে; কিন্তু প্রতিটি বৃহত্তর যুদ্ধই মানবসভ্যতার বুকে গভীর ক্ষতের রেখা আঁকিয়া দেয়। বর্তমান ইরান যুদ্ধও তাহার ব্যতিক্রম নহে। ইহা এমন এক বহুমাত্রিক সংকটের জন্ম দিতেছে, যাহা কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নহে, সমগ্র পৃথিবীর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করিয়া তুলিতেছে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের খুব ছোট্ট করিয়া উচ্চারণ করিতে চাই- ‘পৃথিবীর মানুষ কষ্টে রহিয়াছে’। যুদ্ধের ময়দানে গোলা-বারুদ মিসাইল, ড্রোনের শব্দ শুনা যায়; কিন্তু তাহার প্রতিধ্বনি পৌঁছায় সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের চুলায়, বাজারের দরে এবং দৈনন্দিন জীবনের অনিশ্চয়তায়। এই যুদ্ধ কেবল সামরিক সংঘর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নহে, বরং ইহা বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য, মানবিক সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করিতেছে।
প্রথমত, হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল ভাঙিয়া পড়িতেছে। পণ্য পরিবহন ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাইতেছে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সার ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটিতেছে। ইহার পাশাপাশি এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় গ্যাসের মূল্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছে। ইহা শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং দৈনন্দিন জ্বালানি ব্যবহারের উপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করিতেছে। এই সকল কারণ মিলিয়া একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সংকটের জন্ম দিতেছে। এমনকি এই যুদ্ধ সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করিয়াছে। বিশেষত জ্বালানি অবকাঠামোর উপর সম্ভাব্য সাইবার আক্রমণ বিশ্ব-অর্থনীতিতে আরও বড় ধরনের বিপর্যয় ডাকিয়া আনিতে পারে। সুতরাং ইহা স্পষ্ট যে, এই সংঘাতের প্রভাব কেবল সংশ্লিষ্ট দেশসমূহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকিবে না, বরং সমগ্র বিশ্বই তাহার অভিঘাতে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হইবে।
দুঃখজনকভাবে, বিশ্বের মহারথীরা-যাহারা নিজেদের কৌশলগত স্বার্থরক্ষার নামে যুদ্ধ পরিচালনা করেন-তাহাদের নিকট এই সংকট হয়তো কেবল একটি সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব; কিন্তু সাধারণ মানুষের নিকট ইহা জীবনের প্রশ্ন। আজ একজন শ্রমিক জানেন না, আগামীকাল তাহার কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য জ্বালানি থাকিবে কি না। একজন গৃহিণী জানেন না, চুলায় গ্যাস জ্বলিবে কিনা। একজন কৃষক জানেন না, উৎপাদিত পণ্য বাজারে পৌঁছাইবে কি না। এই অনিশ্চয়তা-এই ভয়ের পরিবেশ-ইহাই যুদ্ধের প্রকৃত রূপ। অন্যদিকে, বৃহৎ শক্তিগুলির পারস্পরিক প্রতিযোগিতাও এই সংকটকে আরও জটিল করিয়া তুলিতেছে। একদিকে যুদ্ধ চলিতেছে, অন্যদিকে অন্য পরাশক্তিরা সুযোগ গ্রহণ করিয়া নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করিতেছে। ফলে যুদ্ধ কেবল একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকিতেছে না-ইহা ধীরে ধীরে একটি বৈশ্বিক শক্তির খেলায় পরিণত হইতেছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে-এই যুদ্ধের শেষ কোথায়? যদি কোনো সুস্পষ্ট লক্ষ্য না থাকে, যদি কোনো গ্রহণযোগ্য পরিণতি নির্ধারিত না থাকে, তাহা হইলে যুদ্ধ কেবল দীর্ঘায়িত হইবে। আর সেই দীর্ঘায়নের প্রতিটি মুহূর্তে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট বহুগুণ বৃদ্ধি পাইবে। অথচ, অধিকাংশ মানুষ জানেই না কীসের জন্য তাহারা এই ভোগান্তি সহ্য করিতেছে! কেন এই যুদ্ধ? যুদ্ধের কারণ, ভূরাজনীতি, কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা-এই সকলই সাধারণ মানুষের বোধের বাহিরে থাকে। তাহারা অত কিছু বোঝেন না-তাহারা বোঝেন শুধু রুটি ও রুজির মূল্য।
যুদ্ধজনিত ভোগান্তির শিকার বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ, অথচ যুদ্ধের সিদ্ধান্ত লইয়া থাকেন অল্পসংখ্যক ক্ষমতাবান ব্যক্তি! এমতাবস্থায় আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, এই রথী-মহারথীদের মধ্যে কি মনুষ্যত্ববোধের অভাব রহিয়াছে? তাহারা কেন অনুভব করিতে পারেন না কোটি কোটি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি? যদি এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহা হইলে ইহা মানবিক বিপর্যয়, শরণার্থী সংকট, অর্থনৈতিক মন্দা এবং বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার এক ভয়াবহ চক্র সৃষ্টি করিবে। সুতরাং, রথী-মহারথীদের বুঝিতে হইবে-এই পৃথিবী কেবল তাহাদের কৌশলগত দাবার বোর্ড নহে-ইহা কোটি কোটি মানুষের বাসভূমি। প্রতিটি সিদ্ধান্তের সহিত জড়িত থাকে অগণিত জীবনের ভাগ্য। তাহাদের কান পাতিয়া শুনিতে হইবে কোটি কোটি মানুষের নিদারুণ কষ্টধ্বনি-'উই আর সাফারিং'।
