স্মৃতির মেঠো পথে বৈশাখী হাওয়া

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৫:৪৫

শৈশব আর কৈশোরের দিনগুলোতে পহেলা বৈশাখ মানে কেবল একটি তারিখ পরিবর্তন ছিল না; তা ছিল প্রাণের স্পন্দন, মাটির ঘ্রাণ আর এক বুক রঙিন স্বপ্নের হাতছানি। আজ যখন নাগরিক যান্ত্রিকতার ভেতর দাঁড়িয়ে বৈশাখের কড়া রোদ দেখি, মনের আয়নায় ভেসে ওঠে উত্তরের সেই ধুলোমাখা মেঠো পথ আর বটতলার মেলার অমলিন স্মৃতি। আমাদের সময়ে পহেলা বৈশাখ আসত হৃদয়ের কপাটে কড়া নেড়ে, কোনো কৃত্রিম আয়োজন ছাড়াই। ২০ বছর আগের সেই উৎসবের ধরন আর আজকের চাকচিক্যের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। তখন বৈশাখ ছিল অন্তরের, আর এখন তা যেন অনেকটা প্রদর্শনের।

আমার শৈশবের বৈশাখ শুরু হতো চৈত্রের শেষ বিকেলের চৈত্র সংক্রান্তি দিয়ে। বাড়িঘর ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা, উঠোনে আল্পনা দেওয়া আর তিলের নাড়ু বা মুড়ির মোয়ার গন্ধে ম ম করত চারপাশ। পহেলা বৈশাখের সকালে পান্তা-ইলিশের চেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল নতুন জামার সুবাস। সেই জামার পকেটে কয়েকটা খুচরো পয়সা থাকলেই যেন পুরো দুনিয়া জয়ের আনন্দ পেতাম। ভোরবেলা ঘুমের ঘোরেই কানে ভেসে আসত পাড়ার মুপ থেকে ভেসে আসা গানের সুর। বড়দের হাত ধরে মেলার পথে যাত্রা শুরু হতো।

গ্রামের সেই মেলা ছিল এক জাদুর শহর। মাটির তৈরি রঙিন ঘোড়া, হাতি আর রংবেরঙের মাটির ব্যাংক-যেখানে পরবর্তী এক বছরের সঞ্চয়ের স্বপ্ন লুকানো থাকত। বাঁশের বাঁশির পিপি শব্দ আর নাগরদোলার কিড়মিড় আওয়াজে এক অদ্ভুত ঐক্যতান তৈরি হতো মেলা প্রাঙ্গণে। কদমা, বাতাসা আর খই-মুড়কির সেই স্বাদ আজও জিভে লেগে আছে, যা বর্তমানের আধুনিক কোনো যান্ত্রিক মিষ্টান্ন দিতে পারে না।

কৈশোরে পা দিয়ে বৈশাখের আনন্দটা কিছুটা বাঁক বদল করল। তখন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর সাহিত্যচর্চা। তবে বৈশাখী আমেজকে আরও প্রাণবন্ত করতে আমরা পাড়ার ছোট-বড় ছেলেরা মিলে পিকনিক বা বনভোজনের আয়োজন করতাম। ২০ বছর আগে এখনকার মতো ক্যাটারিং সার্ভিস বা রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কেনার চল ছিল না। চাঁদা তোলা থেকে শুরু করে চুলা খোঁড়া, খড়ি কুড়ানো আর রান্নার তদারকি-সবকিছুর মধ্যেই ছিল এক অকৃত্রিম ভ্রাতৃত্ববোধ। সেই ধোঁয়া ওঠা ভাতের স্বাদ যেন বাড়ির সাধারণ খাবারের চেয়েও শতগুণ বেশি মনে হতো।

শুধু পিকনিক নয়, আমাদের বৈশাখী উদযাপনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল খেলাধুলা। প্রতিবছর এলাকার সবচেয়ে বড় ফুটবল মাঠ 'রানীবাড়ী চাঁদপুর ইউনাইটেড ক্লাব ফুটবল মাঠে' আমরা প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করতাম। সেই টানটান উত্তেজনার ম্যাচ দেখতে ভিড় জমাত গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতা। জয়-পরাজয় ছাপিয়ে সেই খেলার মাঠটি হয়ে উঠত আমাদের মিলনমেলা। বিকেলে যখন ধুলো উড়িয়ে মাঠে দৌড়াতাম, তখন মনে হতো বৈশাখ মানেই এই বাঁধভাঙা উল্লাস। বর্তমানের কিশোররা যখন স্মার্টফোনের স্ক্রিনে গেম খেলে সময় কাটায়, তখন আমাদের সেই ঘামঝরা বিকেলগুলো মনে করিয়ে দেয়-প্রকৃত আনন্দের উৎস কোথায় ছিল।

আরেকটি বড় অনুষঙ্গ ছিল হালখাতা। বাবার সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দোকানে গিয়ে লাল মলাটের নতুন খাতা খোলা দেখা আর মিষ্টি-নিমকির প্যাকেটে ভাগ বসানো ছিল পরম তৃপ্তি। তখন কার্ড বা অনলাইনের লেনদেন ছিল না, ছিল পারস্পরিক বিশ্বাসের সম্পর্ক। দোকানদারদের হাসিমুখ আর কুশল বিনিময়ের সেই প্রথাটি ছিল সামাজিক বন্ধনের এক অনন্য উদাহরণ। এখনকার ডিজিটাল লেনদেনের যুগে সেই আন্তরিকতা খুঁজে পাওয়া ভার।

আজকের বৈশাখ অনেক বেশি জৌলুসপূর্ণ, পান্তা-ইলিশের ফ্যাশনে ভরপুর, কিন্তু কোথাও যেন সেই প্রাণের টানট হারানো। ২০ বছর আগে বৈশাখ ছিল অসাম্প্রদায়িক মিলনের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ, আর এখন তা অনেকটা যান্ত্রিকতা আরা স্মার্টফোনের ছবির বন্যায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। এখন উৎসব মানেই যেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে জাহির করা। কিন্তু আমার কাছে পহেলা বৈশাখ আজও মানে-সেই মেঠো পথের ধুলো, রানীবাড়ীর সেই ফুটবল মাঠের উত্তেজনা আর গ্রামের শান্ত দুপুরের নির্মল আনন্দ।

শৈশব-কৈশোরের সেই দিনগুলো বারবার মনে করিয়ে দেয়, আমাদের আত্মার শান্তি লুকিয়ে আছে সেই মাটির কাছাকাছি, আমাদের ঐতিহ্যের পরশে। নতুন বছর সবার জীবনে নিয়ে আসুক সেই হারানো দিনের সরলতা আর অনাবিল সুখ।

এস কে হেলাল, শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

ইতেফাক/আইএ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন