এ কেমন নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতা!

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:২৯

সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের সমাজমানসে নিষ্ঠুরতা ও নির্দয়তার যে ভয়াবহ চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে, তাহা কেবল উদ্বেগজনকই নহে, বরং বিবেকবান মানুষের জন্য চরম লজ্জার কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। অবলা পশু-পাখির প্রতি যেই প্রকার নৃশংস আচরণ আমরা প্রত্যক্ষ করিতেছি, তাহা কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় বহন করে না। মাজারের পুকুরে জীবন্ত কুকুর কিংবা মুরগি ছুড়িয়া দিয়া কুমিরের ভক্ষণ দৃশ্য ধারণ করা এবং তাহা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করিয়া পৈশাচিক আনন্দ লাভ করা মানবিক বিকৃতিরই এক চরম বহিঃপ্রকাশ। বনের হরিণ ধরিয়া তাহার পায়ে নির্দয়ভাবে কোপ দেওয়া ও সেই ছবি ফেসবুকে ছাড়িয়া দেওয়া কিংবা পথের কুকুর- বিড়ালকে অকারণে পিটাইয়া মারিবার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, আমাদের হৃদয়ে মায়া-মমতার স্থান দখল করিয়াছে আদিম হিংস্রতা।

অথচ এই জনপদের সংখ্যাগুরু মানুষের ধর্ম ইসলাম পশু-পাখির প্রতি সদয় হইবার নিমিত্তে সুস্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশনা প্রদান করিয়াছে। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হইয়াছে যে, ভূপৃষ্ঠে বিচরণশীল সকল প্রাণীই আল্লাহর একেকটি পরিবারভুক্ত। হাদিস শরিফে রসুলুল্লাহ (সা.) বলিয়াছেন : ‘তোমরা জমিনবাসীদের প্রতি দয়া করো, তাহা হইলে আসমানবাসী (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি দয়া করিবেন।' (সুনানে তিরমিজি) এমনকি পশু জবাই বা কোরবানির ক্ষেত্রেও ইসলামের বিশেষ আদব রহিয়াছে। এক পশুর সম্মুখে অন্য পশুকে জবাই করা কিংবা পশুর প্রাণ পূর্ণরূপে নির্গত হইবার পূর্বে তাহার চামড়া খসানো ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কোনো পশু-পাখিকে অহেতুক আটকে রাখা বা আটক অবস্থায় খাইতে না দেওয়া অথবা কোনোরূপ কষ্ট দেওয়া ইত্যাদিও ধর্মীয় বিধিবিধানের লঙ্ঘন। ধর্ম যেইখানে পশুর প্রতি সংবেদনশীল হইবার শিক্ষা দেয়, সেইখানে ধর্মের দোহাই দিয়া বা বিকৃত আনন্দ লাভের আশায় প্রাণীর ওপর অত্যাচার চালানো যে ঘোরতর অপরাধ ও পাপ, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই।

পরিতাপের বিষয় এই যে, বর্তমান বাংলাদেশে নিষ্ঠুরতার এই বিষবৃক্ষ কেবল ইতর প্রাণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাই; বরং খোদ মানুষের প্রতি মানুষের আচরণ আজ চরম অমানবিক হইয়া উঠিয়াছে। পারিবারিক কলহ হইতে শুরু করিয়া সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে যেই সহিংসতা বিদ্যমান, তাহা দেখিলে শরীর শিহরিত হইয়া উঠে। উন্নয়নশীল দেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের নামে যেইরূপ হামলা, মামলা ও নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানো হয়, তাহা কোনো গণতান্ত্রিক বা সভ্য রাষ্ট্রে কল্পনা করাও দুষ্কর। ভিন্নমতের মানুষকে বৎসরের পর বৎসর বিনা বিচারে কারারুদ্ধ রাখা, প্রাপ্য কারাবিধি বা ‘ডিভিশন' হইতে বঞ্চিত করা এবং গুম-খুনের মতো জঘন্য সংস্কৃতি আজ সমাজকে এক অন্ধকার গহ্বরের দিকে ঠেলিয়া দিতেছে। আবার বিশ্বে যুদ্ধবিগ্রহের নামে যখন বেসামরিক মানুষের ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, প্রার্থনালয়, সভ্যতা বা সংস্কৃতির প্রতীক বা স্থাপনা প্রভৃতির ওপর বোমাবর্ষণ করা হয়, নারী ও শিশুসহ নিরপরাধ ব্যক্তিকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়, তখন এই নরপিশাচরা আর মানুষ থাকে না, তাহারা পশুর চাইতে নিকৃষ্ট প্রাণীতে পরিণত হয়।

প্রকৃতপক্ষে যখন সমাজে মানুষের জীবনের মূল্য তুচ্ছ হইয়া যায়, তখন পশুপাখির প্রতি নির্দয়তা স্বাভাবিক পরিণতি বলিয়াই গণ্য হয়। যেই হাত রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় নিজ ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত হইতে দ্বিধা করে না, সেই হাত বনের হরিণ বা পথের কুকুরের প্রতি সদয় হইবে—এমন আশা করা বাতুলতা মাত্র। এই নৈতিক অবক্ষয় রোধ করিতে হইলে কেবল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করিলে চলিবে না, বরং প্রকৃত ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিক শিক্ষার ব্যাপক প্রচার ও প্রসার প্রয়োজন। রাষ্ট্রকে যেমন নাগরিকদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করিতে হইবে, তেমনই সমাজকেও পশু-পাখি ও পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীল হইতে হইবে। মানুষ যদি মানুষের প্রতি দয়ালু না হয় এবং সৃষ্টির প্রতি মমতা না দেখায়, তাহা হইলে প্রকৃতির রোষ তথা সৃষ্টিকর্তার আজাব অনিবার্য। ইহা হইতে মুক্তির জন্য আমাদের সামষ্টিক আত্মোপলব্ধি ও চারিত্রিক সংশোধনের কোনো বিকল্প নাই।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন