আয়নায় কি নিজেদের দেখি?

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪০

আমরা প্রায়ই উন্নয়নকে দূরের কোনো আলোকবর্তিকা বলিয়া কল্পনা করি-যেন ইহা কেবল কিছু নীতিমালা, কিছু প্রকল্প, কিছু স্বপ্ন-কল্পনা। অথচ উন্নয়ন কোনো বাহ্যিক বস্তু নহে, যাহা বাহির হইতে আমদানি করা যায়। বরং ইহা একপ্রকার অভ্যন্তরীণ রূপান্তর-একটি জাতির সম্মিলিত চরিত্রের ধীর, নিঃশব্দ বিবর্তন। এই ক্ষেত্রে একটি সহজ অথচ নির্মম সত্য রহিয়াছে-যাহা আমরা উচ্চারণ করিতে সংকোচ বোধ করি। তাহা হইল-যেই পর্যন্ত একটি দেশের বৃহত্তর অংশের মানুষ শৃঙ্খলাবোধে অভ্যস্ত না হয়, সেই পর্যন্ত সেই দেশ উন্নতির পথে চলিবার উপযুক্ত হইয়া উঠে না। আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলিতে পারি-উন্নয়ন কোনো দয়া নহে, কোনো কৌশল নহে; ইহা একপ্রকার যোগ্যতা, যাহা অর্জন করিতে হয়। আর এই যোগ্যতার মূলভিত্তি হইল শৃঙ্খলা-নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করিবার ক্ষমতা, নিয়ম মানিবার অভ্যাস এবং অন্যের অধিকারের প্রতি অবিচল সম্মান।

এই ক্ষেত্রে আয়নায় নিজেদের দেখিতে হইবে-আমরা কি সত্যই শৃঙ্খলাবদ্ধ? নাকি আমরা কেবল সুযোগের অপেক্ষায় থাকি-কোথায় নিয়ম ভাঙিয়া একটু সুবিধা লওয়া যায়? রাস্তার মোড়ে, অফিসের ফাইলে, বাজারের দরদামে-আমরা কি প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য খেলায় অংশগ্রহণ করি না, যেইখানে বুদ্ধিমত্তার নাম দিয়া আমরা অসততাকেই বৈধতা দিই? অথচ আমরা বুঝি না-'বিশৃঙ্খল জাতি উন্নতি করিতে পারে না'। ইহা কোনো নৈতিক বাণী নহে, ইহা একপ্রকার বাস্তবতার সমীকরণ। শৃঙ্খলা মানে কেবল বাহ্যিক নিয়ম পালন নহে-ইহা একপ্রকার অভ্যন্তরীণ স্থিতিও। যেই সমাজে মানুষ নিয়মকে শত্রু বলিয়া গণ্য করে, সেইখানে উন্নয়ন সর্বদা একটি অনিশ্চিত জুয়া। আজ কিছু অগ্রগতি হইল, কালই তাহা ভাঙিয়া পড়িল-কারণ ভিতরে কোনো দৃঢ়তা নাই।

সুতরাং চালাকি, ফাঁকি এবং স্বল্পমেয়াদী লাভের প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণ আসলে আমাদের সর্বনাশের পথই প্রশস্ত করে। আমরা অনেক সময় ইহাকে বুদ্ধি বলিয়া অভিহিত করি, কৌশল বলিয়া প্রশংসা করি; কিন্তু এই তথাকথিত বুদ্ধি আসলে একপ্রকার আত্মঘাতী প্রবণতা। কারণ, প্রতারণা কোনোদিনই সমষ্টিগত সাফল্যের ভিত্তি হইতে পারে না। ইহা কেবল আস্থার মৃত্যু ঘটায়-আর আস্থা ছাড়া কোনো সমাজ টিকিয়া থাকিতে পারে না। ধরা যাউক, একটি বাজার, যেইখানে প্রত্যেক বিক্রেতা ক্রেতাকে ঠকাইতে চাহে, এবং প্রত্যেক ক্রেতা বিক্রেতাকে সন্দেহ করে। সেইখানে কি কোনো সুস্থ অর্থনীতি গড়িয়া উঠিতে পারে? কিংবা একটি রাষ্ট্র, যেইখানে নাগরিকেরা নিয়ম মানিবার চাইতে নিয়ম এড়াইবার উপায় সন্ধান করিতে অধিক আগ্রহী-সেইখানে কি কোনো স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব? উত্তর সুস্পষ্ট; কিন্তু আমরা ইহা উচ্চারণ করিতে অনীহা বোধ করি।

আমরা প্রায়ই ভাবি-অমুক দেশ উন্নত, কারণ তাহাদের সম্পদ বেশি, প্রযুক্তি উন্নত: কিন্তু আমরা কি লক্ষ করি না, তাহাদের শক্তির মূলে আছে একধরনের সামাজিক শৃঙ্খলা, একটি পারস্পরিক আস্থা। অন্যদিকে, যখন একটি সমাজে এই শৃঙ্খলা ও আস্থার যখন অভাব থাকে, তখন উন্নয়ন একটি ভঙ্গুর মুখোশে পরিণত হয়। বাহিরে চকচকে, ভিতরে শূন্য। সেইখানে প্রতিটি মানুষ অন্যকে প্রতারিত করিবার সম্ভাব্য শত্রু বলিয়া দেখিতে শিখে। প্রতিদিনকার ছোট ছোট আচরণে, নিয়ম মানিবার কিংবা ভাঙিবার ক্ষুদ্র সিদ্ধান্তে, ধীরে ধীরে নির্মিত হয়। সুতরাং, একটি দেশের নির্বাহী প্রধানেরও দায়িত্ব এইখানে গুরুত্বপূর্ণ হইয়া উঠে। কেবল আইন প্রণয়ন করিলেই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয় না-প্রয়োজন একটি নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ। শৃঙ্খলা, সততা ও দায়িত্ববোধের চর্চা নিশ্চিত করা।

এখন প্রশ্ন হইল-আমরা কি সেই জাতি, যাহারা সাময়িক লাভের মোহে নিজের ভবিষ্যৎ
বিক্রয় করিতে প্রস্তুত? নাকি আমরা সেই জাতি, যাহারা বুঝিতে শিখিয়াছি-শৃঙ্খলা কোনো বাধা নহে, ইহাই মুক্তির পথ? কারণ, জোচ্চুরি, ঠকবাজি, ফোরটোয়েন্টিগিরি-ইহারা কখনো দীর্ঘপথের সঙ্গী নহে। ইহারা ক্ষণস্থায়ী ছায়া, যাহা প্রথমে আশ্রয় দেয়, পরে অন্ধকারে ঠেলিয়া দেয়। অতএব, উন্নয়নকে যদি সত্যিই আমরা টিকসই করিতে চাই, তাহা হইলে আমাদের প্রথম কাজ হইবে নিজেদের আয়নায় নির্ভীক দৃষ্টিতে দেখা-আমরা কতখানি ডিসিপ্লিনড?

ইত্তেফাক/এমএস

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন