মব কালচার ও বিচারহীনতার অভিশাপ

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৩০

সম্প্রতি নরসিংদীর রায়পুরায় সরকারি আদিয়াবাদ ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ নুর সাখাওয়াত হোসেন মিয়ার উপর যে বর্বরোচিত হামলা হইয়াছে, তাহা মব সংস্কৃতিরই এক কদর্য বহিঃপ্রকাশ। একজন অধ্যক্ষ, যিনি সমাজের আলোকবর্তিকা ও মানুষ গড়িবার কারিগর, তাহাকে একদল বহিরাগত উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি প্রকাশ্য দিবালোকে নিজ কর্মস্থলে লাঞ্ছিত করিয়াছে। এমনকি তাহাকে টানিয়া হ্যাঁচড়াইয়া কক্ষ হইতে বাহির করিবার দুঃসাহসও তাহারা দেখাইয়াছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, একদা আমাদের সমাজে শিক্ষকগণ যে উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন, আজিকার দিনে স্বার্থান্বেষী মহলের অপতৎপরতার কারণে সেই সম্মান ধূলিসাৎ হইতেছে। অধ্যক্ষকে লাঞ্ছিত করিতে বর্তমান প্রজন্মের অনেকের বিবেকের দংশনও কাজ করিতেছে না। যতদূর জানা যায়, এই হামলার মূলে রহিয়াছে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজির অপচেষ্টা। মব সৃষ্টিকারীরা পরিস্থিতিকে পুঁজি করিয়া নিজেদের আখের গুছাইতে চাহে, যাহা একটি সভ্য সমাজের জন্য অশনিসংকেত।

গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে ‘মব’ বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার দ্বারা আইন নিজের হস্তে তুলিয়া লওয়ার প্রবণতা এক নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। সেই সময়ে সমগ্র দেশে বিভিন্ন স্থানে মব সৃষ্টির মাধ্যমে অনেকে শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হন, ঘটে হতাহতের ঘটনাও। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর হইতে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসের শাসনামলে বাংলাদেশে ৪১৩টি মব সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ২৫৯ জন নিহত হইয়াছেন। আহত হইয়াছেন ৩১৩ জন। অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হইতেছে, মব কালচারের সেই বিষবৃক্ষ আজও যে সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব হয় নাই, রায়পুরার এই ঘটনাই তাহার প্রমাণ। মব বলিতে সাধারণত কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে একত্রিত একদল উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে বুঝায়, যাহারা সাময়িক আবেগের বশবর্তী হইয়া অথবা পরিকল্পিতভাবে সহিংসতায় লিপ্ত হয়। তাহারা অনেক সময় স্রেফ গুজবের ভিত্তিতে সংঘবদ্ধ হইয়া সহিংসতা চালায়। আর যখন সাধারণ মানুষ আইনি প্রক্রিয়া (পুলিশ, আদালত) উপেক্ষা করিয়া কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গণপিটুনি, নির্যাতন বা হত্যার মাধ্যমে সরাসরি শাস্তি দেয়, তখন তাহাকে বলে 'মব জাস্টিস' বা ‘গণবিচার’। ইহার কোনো ধরনের আইনগত বৈধতা নাই, বরং ইহা একটি ফৌজদারি অপরাধ বা ‘মব সন্ত্রাস' হিসাবে গণ্য। ইহার মোকাবিলা করা বর্তমান সরকারের সময়ও চ্যালেঞ্জ হইয়া দাঁড়াইয়াছে।

সভ্য সমাজে আইনের শাসন যেইখানে সর্বজনীন, সেইখানে মব জাস্টিস হইল এক আদিম ও অসভ্য প্রথা, যাহা কোনো সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থায় কাম্য হইতে পারে না। দেশে বর্তমানে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের অবস্থান বদলাইয়া ক্ষমতার দাপট দেখাইতেছে। আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত থাকিলে আজ এই অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হইত না। রাষ্ট্রযন্ত্রের দুর্বলতার সুযোগ লইয়াই এই মব সৃষ্টিকারীরা বারংবার সমাজকে অস্থির করিয়া তুলিতেছে। অথচ মব যাহারা সৃষ্টি করিতেছে, তাহাদের রাজনৈতিক পরিচয় যাহাই হউক এবং তাহারা নিজেদের যতই শক্তিশালী মনে করুক না কেন, রাষ্ট্রের শক্তির নিকট তাহারা নস্যি। রাষ্ট্র যদি কঠোর হস্তে এই অরাজকতা দমন না করে, তাহা হইলে সমাজ অচিরেই এক ভয়াবহ বিশৃঙ্খলার গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হইবে।

কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীই আইনের ঊর্ধ্বে নহে। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে এবং জনমনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতে মব কালচার বা অনুরূপ ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অতি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। অভিযুক্তদের চিহ্নিত করিয়া দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা না হইলে, সমাজ হইতে এই অপসংস্কৃতির অভিশাপ দূর করা সম্ভব হইবে না। আমরা প্রত্যাশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনতিবিলম্বে এই হামলার বিচার করিয়া আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করিবেন। এইখানে দলীয় পরিচয় বা ক্ষমতার দাপট যেন বিচারের পথে অন্তরায় না হয়। আমরা মনে করি, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষা এবং শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারে এই মব সৃষ্টিকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা অপরিহার্য।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন