বর্তমান বিশ্ব এক চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়া অতিবাহিত হইতেছে। একদিকে সমরাস্ত্রের ঝনঝনানি ও যুদ্ধের উন্মাদনা, অন্যদিকে জঠরানলে দগ্ধ কোটি কোটি নিরন্ন মানুষের আর্তনাদ। এই বৈপরীত্য আজ মানবসভ্যতাকে এক চরম লজ্জার সম্মুখীন করিয়াছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংস্থা ‘ওচা’র প্রধান টম ফ্লেচার যে তথ্য প্রকাশ করিয়াছেন, তাহা কেবল উদ্বেগজনকই নহে, বরং বিশ্বনেতৃবৃন্দের নৈতিক দেউলিয়াপনার এক নগ্ন দলিল। তাহার মতে, ইরান ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাত ও সমরাস্ত্রের পশ্চাতে প্রতিদিন প্রায় ২০০ কোটি ডলার ব্যয় হইতেছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় এই যে, মাত্র কয়েক সপ্তাহের এই যুদ্ধব্যয় দিয়া জাতিসংঘের বার্ষিক মানবিক তহবিলের সমুদয় অর্থসংস্থান সম্ভব ছিল। জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সহায়তা পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজন মোট ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। এই অর্থের সংস্থান করা গেলে ইহা দ্বারা বিশ্বের প্রায় ৮ কোটি ৭০ লক্ষ দুর্গত মানুষের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।
এই পরিসংখ্যান হইতে ইহা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, বর্তমান বিশ্বে মানুষের জীবনের মূল্য অপেক্ষা ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্রের গুরুত্ব অধিক হইয়া দাঁড়াইয়াছে। যখন জনকল্যাণ ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য অর্থের অভাব দেখা দেয়, তখন বড় দেশসমূহ অর্থসংকটের অজুহাত প্রদর্শন করে; অথচ যুদ্ধের দামামা বাজিলে তাহাদের ভান্ডার অফুরন্ত হইয়া উঠে। জাতিসংঘের মানবিক তহবিলে বর্তমানে প্রায় এক হাজার কোটি ডলারের ঘাটতি রহিয়াছে, তাহাকে টম ফ্লেচার ‘প্রলয়ংকরী' বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। বিশেষ করিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ন্যায় শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহ যখন সামরিক বাজেট বৃদ্ধি করিয়া বৈদেশিক সাহায্য বা মানবিক অনুদান হ্রাস করে, তখন বিশ্বব্যাপী এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়।
যুদ্ধের এই সর্বগ্রাসী প্রভাবে কেবল রণক্ষেত্রই রক্তাক্ত হইতেছে না, বরং ইহার দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত বিশ্বের দরিদ্র দেশসমূহের উপর বিশেষত আফ্রিকা মহাদেশের উপর নিপতিত হইতেছে মারাত্মকভাবে। সংঘাতের ফলে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্য প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পাইয়াছে, যাহা কোটি কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্যের দিকে ঠেলিয়া দিতেছে। তদুপরি, প্রভাবশালী রাষ্ট্রনেতাদের আক্রমণাত্মক ও সহিংস ভাষা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতাকে আরো বিপন্ন করিয়া তুলিতেছে। আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করিয়া সাধারণ মানুষ ও অবকাঠামোর উপর হামলা আজ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হইয়াছে। যুদ্ধ শহর ধ্বংস করিয়া, অবকাঠামো ভাঙিয়া ফেলিয়া এবং উৎপাদনব্যবস্থা ব্যাহত করিয়া সরাসরি ডাকিয়া আনে চরম দারিদ্র্য। আমরা জানি, রাশিয়া- ইউক্রেন যুদ্ধের প্রথম তিন মাসেই বিশ্বে ৭ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ নূতন করিয়া দারিদ্র্যসীমার নিচে চলিয়া যায়। এইভাবে যুদ্ধ শুধু বর্তমান প্রজন্ম নহে, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ধ্বংস করিয়া দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র তৈরি করে।
এইখানে আরো একটি গভীর পরিতাপের বিষয় হইল, যাহারা আর্তমানবতার সেবায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করিয়াছেন, সেই ত্রাণকর্মীরাও আজ সুরক্ষিত নহেন। গত তিন বৎসরে সহস্রাধিক মানবিক কর্মী যুদ্ধের কারণে নিহত হইয়াছেন। তাহাদের হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে যে, যুদ্ধবাজ শক্তিগুলি আজ ন্যূনতম মানবতাবোধ ও হিতাহিত জ্ঞান হারাইয়া ফেলিয়াছে। কেবল বিবৃতির মাধ্যমে এই পাশবিকতা রোধ করা সম্ভব নহে; বরং ইহার জন্য বিশ্বনেতৃবৃন্দের সদিচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপ একান্ত আবশ্যক। অতএব, ধ্বংসের নেশায় মত্ত না হইয়া বিশ্বকে রক্ষার ব্রত গ্রহণ করাই হউক বর্তমান সময়ের প্রধান লক্ষ্য। কামানের গোলার পরিবর্তে যদি ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন তুলিয়া দেওয়ার সংকল্প করা হইত, তাহা হইলে এই পৃথিবী বাসযোগ্য ও সুন্দর হইয়া উঠিত। যুদ্ধ কখনো শান্তি আনিতে পারে না, বরং ইহা কেবল বিনাশেরই বার্তা বহন করে। বিশ্ববিবেকের নিকট আমাদের আকুল আবেদন—রক্তপাত বন্ধ হউক, মানবতার জয় হউক। সমরাস্ত্রের অর্থ ব্যয় করা হউক মুমূর্ষু মানুষের জীবন রক্ষায়। নচেৎ ইতিহাস কাহাকেও ক্ষমা করিবে না।
