পৃথিবী কেবল শক্তিধরদের খেলাঘর নহে

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:০০

কোনো ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় যখন কোনো এলাকা দিয়া বহিয়া যায়, তখন ইহার মধ্যবর্তী অংশের 'চোখ' অতিক্রমের সময় ঝড়টা যেন থমকাইয়া থাকে বিরতি দেয়। এখন কি তেমনই বিরতির মুহূর্ত? একদিকে যুদ্ধ, অন্যদিকে জ্বালানিসংকট-কোথাও খাদ্য উৎপাদনের ভগ্নরেখা, কোথাও দুর্ভিক্ষের ছায়া দীর্ঘতর হইতেছে। এই সমগ্র সংকটের কেন্দ্রে দাঁড়াইয়া একটিই প্রশ্ন আমাদের বিবেককে নিরন্তর আঘাত করিতেছে-কেন? কাহার দায়ে এই বৈশ্বিক বিপর্যয়? ইহা কি মানবসভ্যতার গভীরে গোপন কোনো নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন?

আজ পৃথিবীর বৃহৎ সিদ্ধান্তসমূহ গ্রহণ করা হইতেছে এমন কক্ষের অন্তরালে, যাহা সাধারণ মানুষের নাগালের বহু দূরে। সেই কক্ষে আলো মৃদু, বাতাস শীতল, পানীয় মূল্যবান; কিন্তু সেই শীতলতার অন্তরালে যে সিদ্ধান্ত লওয়া হয়, তাহা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনমরণ নির্ধারণ করিয়া দেয় ঘোষণা কিংবা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় অথবা জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করা-এই ধরনের প্রতিটি সিদ্ধান্তের অভিঘাতে পৃথিবীর প্রান্তিক মানুষই সর্বপ্রথম আঘাতপ্রাপ্ত হয়। তৈল আজ কেবল জ্বালানি নহে-ইহা ক্ষমতার এক নির্মম প্রতীক। তৈলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ মানে অর্থনীতির শিরায় রক্তপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ। ফলে যখন তৈলের রাজনীতি শুরু হয়, তখন কৃষিক্ষেত্রেও তাহার প্রভাব পড়িতে বাধ্য। সার উৎপাদন ব্যাহত হয়, সেচব্যবস্থা দুর্বল হইয়া পড়ে, পরিবহন খরচ বাড়িয়া যায়-ফলত খাদ্য উৎপাদনও হ্রাস পায়। এই সরল অর্থনৈতিক সূত্রের পেছনে যেই নিষ্ঠুর বাস্তবতা লুকাইয়া আছে, তাহা হইল-ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সাধারণ মানুষের আহার, জীবন-জীবিকা কাড়িয়া লওয়া হইতেছে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠিতে পারে-৮০০ কোটির অধিক মানুষ কেন সম্পূর্ণ অসহায়ের মতো একযোগে চুপ করিয়া রহিয়াছে? তাহারা কি জিম্মি? কী কারণে তাহারা নিশ্চুপ থাকিতে বাধ্য হইতেছে? না, বিষয়টি এত সরল নহে। মানুষের নীরবতা সর্বদা দুর্বলতার প্রতীক নহে-অনেক সময় ইহা একপ্রকার বাধ্যতামূলক স্থবিরতা। বিশ্বব্যবস্থা এমনভাবে নির্মিত হইয়াছে, যাহাতে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রিত, মতামত প্রভাবিত এবং প্রতিবাদের শক্তি বিচ্ছিন্ন ও ক্ষুদ্র করিয়া রাখা হয়। গণমাধ্যম, প্রযুক্তি, অর্থনীতি-সকলই ধীরে ধীরে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হইয়া পড়িয়াছে। ফলে, মানুষের চেতনা পর্যন্ত একপ্রকার অদৃশ্য প্রভাবের অধীন। মানুষ ক্রুদ্ধ হয়, ব্যথিত হয়; কিন্তু সেই ক্রোধ সংগঠিত শক্তিতে রূপান্তরিত হইবার পূর্বেই তাহা বিভক্ত, বিকৃত, কিংবা নিঃশেষ হইয়া যায়। আরো একটি গভীরতর কারণ রহিয়াছে-মানবসভ্যতার অন্তর্গত নৈতিক সংকট। যখন অন্য কোথাও যুদ্ধ হয়, আমরা তাহা সংবাদ হিসাবে গ্রহণ করি। যখন কোথাও শিশু মৃত্যুবরণ করে, আমরা তাহাকে পরিসংখ্যান হিসাবে দেখি। এই বিচ্ছিন্নতা, এই অনুভূতির অবসান-ইহাই শক্তিধরদের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ সৃষ্টি করিয়াছে। কারণ, যখন মানুষ অন্যের দুঃখকে নিজের দুঃখ মনে করে না, তখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাহার প্রতিবাদও শিথিল হইয়া পড়ে। ফলে ক্ষমতাশালীরা জানে-তাহাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বৃহত্তর মানবসমাজের প্রতিক্রিয়া সীমিতই থাকিবে।

তাহা হইলে কি কোনো পথ নাই? নিশ্চয়ই আছে: কিন্তু সেই পথ বাহ্যিক শক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘর্ষের নহে, বরং মানবিক চেতনার পুনর্জাগরণের। মানুষকে পুনরায় উপলব্ধি করিতে হইবে-পৃথিবী কেবল রাষ্ট্র ও শক্তির খেলাঘর নহে-ইহা মানুষের সম্মিলিত অস্তিত্বের ক্ষেত্র। প্রতিবাদ সর্বদা শোরগোলের মাধ্যমে প্রকাশ পায় না, অনেক সময় ইহা বোধের গভীর পরিবর্তনের মাধ্যমে সূচিত হয়।

অতএব, আজকের এই বৈশ্বিক অশান্তি কেবল বাহ্যিক সংঘর্ষের ফল নহে-ইহা আমাদের সম্মিলিত নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থার প্রতিফলন। যদি আমরা সত্যিই এই অচলাবস্থা ভাঙিতে চাই, তাহা হইলে কেবল পরাশক্তি তথা ক্ষমতাশালীদের দিকে আঙুল তুলিলেই চলিবে না; আমাদের নিজেদের ভিতরেও দৃষ্টিপাত করিতে হইবে।

কারণ, পৃথিবীকে যাহারা নিয়ন্ত্রণ করে, তাহারা শক্তিশালী; কিন্তু তাহাদের শক্তির প্রকৃত উৎস কোথায়, তাহা অনুধাবন করিলে আমরা দেখিব, সেই উৎসের একটি অংশ আমাদের মধ্যেই নিহিত। সেই উপলব্ধিই হইতে পারে পরিবর্তনের সূচনা।

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন