পরাশক্তির মিথ ও বিশ্বের নূতন সমীকরণ

আপডেট : ০৫ মে ২০২৬, ০৪:২৮

একসময় ছিল, যখন পৃথিবীর মানচিত্রে একটি শক্তি এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল যে, তাহার সিদ্ধান্তই যেন ছিল চূড়ান্ত বিধান। তাহার অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক বিস্তার— সমস্তই মিলিয়া তাহাকে প্রায় অপরাজেয় বলিয়া প্রতীয়মান করা হইত। বহু রাষ্ট্র, বহু জাতি, এমনকি বহু চিন্তাবিদও বিশ্বাস করিতেন—এই পরাশক্তি অপরাজেয়; কিন্তু ইতিহাসের এক অমোঘ বৈশিষ্ট্য হইল—ইহা কখনো স্থির থাকে না।

সম্প্রতি যুদ্ধ অবসানে ইরানের দেওয়া ১৪ দফা প্রস্তাবের জবাব দিয়াছে যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তানের মাধ্যমে এই জবাব তেহরানের হাতে পৌছাইয়াছে বলিয়া জানাইয়াছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় সূত্র মতে, তেহরানের ১৪ দফা প্রস্তাবে সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চল হইতে সেনা প্রত্যাহার, বন্দরসমূহে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং সর্বপ্রকার শত্রুতামূলক কার্যক্রম বন্ধের আহ্বান জানানো হইয়াছে; লেবাননে সামরিক অভিযানও ইহার অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি ৩০ দিনের মধ্যে চুক্তিতে উপনীত হওয়ার প্রস্তাব এবং যুদ্ধবিরতির পরিবর্তে সরাসরি যুদ্ধের অবসানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হইয়াছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, বর্তমানে কোনো পারমাণবিক আলোচনা চলিতেছে না এবং ইরান পুনরায় দাবি করিয়াছে, তাহাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।

বস্তুত, বর্তমান বিশ্ব আর একমুখী নহে—ইহা বহুমাত্রিক। এইখানে শক্তির কেন্দ্র একাধিক, প্রভাবের রেখা বহুস্তরীয়। এই বাস্তবতায় কোনো আঞ্চলিক সংঘাত আর কেবল আঞ্চলিক থাকে না—ইহা পরিণত হয় বৃহত্তর শক্তিসমূহের অদৃশ্য প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হিসাবে। সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইহাই পরিলক্ষিত হইতেছে। বাহ্যত পরাশক্তিধর রাষ্ট্রটি অপর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সহজেই বিজয় অর্জন করিতে পারিত; কিন্তু অন্তরালে দাঁড়াইয়া আছে আরো বৃহত্তর কিছু শক্তির অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মতো সমর্থন। এই সমর্থন সরাসরি সৈন্য প্রেরণ নহে। বরং অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও কূটনৈতিক ছায়া বিস্তার। ফলে, যাহাকে একা পরাস্ত করা সহজ বলিয়া কেহ কেহ ধারণা করিতেন বটে, বাস্তবে তাহা আর সহজ নহে। আর এইখানেই সেই ‘পরাশক্তি’র বিষয়টি প্রশ্নের সম্মুখীন হইতেছে। এখন পরাশক্তির বিষয়টি যেন অনেকের নিকট এইভাবে প্রতিভাত হইতেছে যে, ইহা যেন একটি মিথ। কিংবা এইভাবে বলা যায় যে, একটি সময় ছিল যখন বিশ্বে এখনকার মতো সমান্তরাল পরাশক্তিতুল্য শক্তিশালী রাষ্ট্র ছিল না। অর্থাৎ, পরাশক্তির মিথ চ্যালেঞ্জ করিবার মতো একাধিক বৃহত্তর শক্তি তখনো পুঞ্জীভূত হয় নাই; কিন্তু বর্তমান সময়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়িয়া অনেকের নিকট মনে হইতে পারে, ‘পরাশক্তি’ মনে করিবার বিষয়টি একটি ‘মিথ’। সেই মিথ কি এখন ভাঙিয়া পড়িতে যাইতেছে?

আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক লক্ষণীয়। ১৪ দফা শান্তির প্রস্তাবে যেই শর্তাবলি উত্থাপিত হইয়াছে—সেনা প্রত্যাহার, অবরোধ প্রত্যাহার, শত্রুতামূলক কার্যক্রমের অবসান—ইহা কেবল একটি যুদ্ধের সমাপ্তির আহ্বান নহে—ইহা ক্ষমতার সীমারেখা পুনর্নির্ধারণের প্রচেষ্টাও বটে। এইখানে বলা হইতেছে, বলপ্রয়োগের একচ্ছত্র অধিকার আর কাহারও একক সম্পত্তি নহে। অর্থাৎ, শক্তির ভারসাম্য এমন এক পর্যায়ে পৌছাইয়াছে, যেইখানে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সকল পক্ষের জন্যই ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত। বিশ্বব্যবস্থার এই পরিবর্তন অন্যত্রও প্রতিফলিত হইতেছে। এমনকি উত্তর আটলান্টিকের যেই সামরিক জোটকে একসময় অপ্রতিরোধ্য বলিয়া বিবেচনা করা হইত, তাহার মধ্যেও এখন প্রশ্ন-সংশয়-ভাঙন-দ্বিধা ও সীমাবদ্ধতা দৃশ্যমান হইতেছে। অতএব, বর্তমান সংঘাত কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নহে—ইহা এক পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতি রূপান্তরেরও সূচক বটে। ইহা দেখাইতেছে, ‘অপরাজেয়' ও ‘পরাশক্তি' মনে করিবার বিষয়টি আসলে একধরনের মিথ– যাহা পরিবর্তিত বাস্তবতার মুখে ভাঙিয়া পড়ে।
যদি এই উপলব্ধিকে যথাযথভাবে অনুধাবন করা যায়, তাহা হইলে হয়তো বিশ্ব আরো ভারসাম্যপূর্ণ, আরো সংলাপনির্ভর একটি পর্যায়ে উপনীত হইতে পারে। অন্যথায়, পুরাতন মিথ আঁকড়াইয়া ধরিয়া রাখিবার চেষ্টা কেবল সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করিবে। এই সমগ্র প্রেক্ষাপট আমাদের এক গভীর সত্যের সম্মুখীন করিতেছে—বিশ্বে কোনো শক্তিই চিরস্থায়ীভাবে একক আধিপত্য বজায় রাখিতে পারে না। শক্তির প্রকৃতি পরিবর্তনশীল এবং প্রতিটি আধিপত্যের মধ্যেই নিহিত থাকে তাহার সীমাবদ্ধতার বীজ।

ইত্তেফাক/এনএন