আমরা আজ এমন এক পৃথিবীতে বাস করি, যেইখানে যুদ্ধ, বিপর্যয়, নির্বাচন, বিপ্লব কিংবা ভূমিকম্প-সকল কিছু মুহূর্তের মধ্যে মানুষের হাতের মুঠায় পৌঁছাইয়া যায়; কিন্তু এই 'তাৎক্ষণিক সংবাদ' পাইবার বিষয়টি একদা ছিল অকল্পনীয়। সন্ধ্যা ৬টার সংবাদ শেষ হইলে মানুষ পরদিন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করিত; কিন্তু 'টেড টার্নার' নামের এক গণমাধ্যম-স্বাপ্নিক সেই সীমাবদ্ধতাকে মানিতে চাহিলেন না। তিনি বিশ্বাস করিতেন-পৃথিবী কখনো ঘুমায় না, সুতরাং সংবাদও ঘুমাইতে পারে না। বলা যায়, মানুষের দেখিবার দৃষ্টি, জানিবার অভ্যাস এবং সময়কে অনুভব করিবার পদ্ধতিই বদলাইয়া দেন যুক্তরাষ্ট্রের সিএনএনের প্রতিষ্ঠাতা টেড টার্নার। গত ৬ মে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় নিজ বাসভবনে ৮৭ বছর বয়সে তাহার মৃত্যু কেবল একজন গণমাধ্যমের অন্যতম পথিকৃতের প্রস্থান নহে-ইহা এক সংবাদ-যুগের অবসান।
টেড টার্নার ১৯৮০ সালের ১ জুন প্রতিষ্ঠা করেন 'কেবল নিউজ নেটওয়ার্ক'-সংক্ষেপে 'সিএনএন'। ইহাই ছিল বিশ্বের প্রথম ২৪ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেল। তখন অনেকে তাহাকে পাগল বলিয়াছিল। সমালোচকেরা ব্যঙ্গ করিয়া নাম দিয়াছিল 'চিকেন নুডুল নিউজ'। কারণ, মানুষ কেন সারাক্ষণ সংবাদ দেখিবে-এই ধারণাই তখন অস্বাভাবিক বলিয়া বিবেচিত হইত: কিন্তু টেড টার্নারের দূরদর্শিতা বুঝিতে হইলে আমাদের স্মরণ করিতে হইবে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের কথা। সেই যুদ্ধ পৃথিবী প্রথম বারের মতো 'লাইভ' দেখিয়াছিল। বাগদাদের আকাশে বোমা পড়িতেছে, আর বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ একই মুহূর্তে তাহা প্রত্যক্ষ করিতেছে। সংবাদ আর কেবল তথ্য থাকিল না-ইহা পরিণত হইল প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায়। সংবাদমাধ্যমের এই বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন টেড টার্নার। তবে তিনি কেবল সংবাদব্যবসায়ী ছিলেন না। তিনি ছিলেন এক বৈপরীত্যে ভরা চরিত্র। কখনো দুঃসাহসী, কখনো আবেগপ্রবণ, কখনো বিতর্কিত, আবার কখনো গভীর মানবিক। ছোটবেলায় কঠোর পিতার নির্মম আচরণ, বোনের দুরারোগ্য ব্যাধিতে মৃত্যু এবং পরবর্তীকালে পিতার আত্মহত্যা-এই সমস্ত আঘাত তাহার ব্যক্তিত্বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করিয়াছিল। মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি পারিবারিক বিজ্ঞাপন ব্যবসার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই ক্ষুদ্র ব্যবসাকেই তিনি পরিণত করেন এক বিশাল মিডিয়া সাম্রাজ্যে।
তাহার প্রতিষ্ঠিত 'টার্নার ব্রডকাস্টিং সিস্টেম' কেবল সিএনএনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি গড়িয়া তোলেন টিএনটি, কার্টুন নেটওয়ার্ক, টার্নার ক্লাসিক মুভিজের মতো জনপ্রিয় মাধ্যম। স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করিয়া তিনি টেলিভিশন সম্প্রচারের ভৌগোলিক সীমাও ভাঙিয়া ফেলেন। আজকের বৈশ্বিক সম্প্রচারব্যবস্থার ভিত অনেকাংশেই তাহার হাতে নির্মিত। তবে টেড টার্নারের আরেকটি পরিচয় সমান গুরুত্বপূর্ণ-পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন। জাতিসংঘকে তিনি এক বিলিয়ন ডলার দান করিয়াছিলেন-যাহা তখন ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ব্যক্তিগত অনুদান। পরিবেশ রক্ষায় বিলুপ্তপ্রায় বাইসন সংরক্ষণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শিশুদের পরিবেশ-সচেতন করিবার জন্য নির্মাণ করেন 'ক্যাপ্টেন প্লানেট' নামের জনপ্রিয় কার্টুন সিরিজ। এইখানেই টেড টার্নার অন্য অনেক মিডিয়া সম্রাট হইতে আলাদা। তিনি কেবল অর্থ উপার্জনের জন্য সংবাদমাধ্যম গড়েন নাই-তিনি বিশ্বাস করিতেন, তথ্য-সংবাদ মানুষের মধ্যে পরিবর্তন ঘটাইতে পারে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলিয়াছিলেন, 'আমেরিকার বহু সমস্যার কারণ হইল-মানুষ যথেষ্ট জানে না।' সংবাদকে তিনি গণতন্ত্রের অক্সিজেন বলিয়া ভাবিতেন।
আজকের পৃথিবীতে সংবাদমাধ্যম ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়া চলিতেছে। গুজব, মিথ্যা তথ্য, রাজনৈতিক বিভাজন এবং বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার চাপে সংবাদ অনেক সময় তাহার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাইতেছে। এই সময়ে টেড টার্নারের জীবন আমাদের এই সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়-সংবাদ হইল গণতন্ত্রের অক্সিজেন। টেড টার্নার আজ আর নাই বটে; কিন্তু পৃথিবীর কোথাও যখন গভীর রাতে একটি সংবাদকক্ষের আলো জ্বলিয়া উঠে, যখন কোনো প্রতিবেদক যুদ্ধক্ষেত্র হইতে সরাসরি সম্প্রচার করেন, যখন মানুষ দূর দেশের ঘটনাও তৎক্ষণাৎ জানিতে পারে-তখন সেই আলোর পেছনে কোথাও না কোথাও টেড টার্নারের স্বপ্ন জ্বলিয়া থাকে। কীর্তিমানের মৃত্যু নাই। আমরা টেড টার্নারের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।
