বাংলাদেশ এমন এক ভূখণ্ড, যাহার কৃষি, অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা প্রকৃতির সহিত নিবিড়ভাবে জড়িত। এই দেশের মানুষ আকাশের মেঘ দেখিয়া ফসলের ভবিষ্যৎ অনুমান করে, নদীর স্রোত দেখিয়া জীবিকার নিরাপত্তা বিচার করে। কিন্তু সাম্প্রতিক বৎসরগুলিতে প্রকৃতি যেন তাহার স্বাভাবিক ছন্দ হারাইতে বসিয়াছে। ঋতুচক্র আর পূর্বের ন্যায় স্থিতিশীল নহে। গ্রীষ্ম দীর্ঘতর হইতেছে, শীত সংক্ষিপ্ত হইয়া পড়িতেছে, আবার বর্ষাও অনেক সময় অনিয়মিত আচরণ করিতেছে। এই অস্বাভাবিকতার মধ্যেই পৃথিবীতে পুনরায় সক্রিয় হইবার আশঙ্কা দেখা দিয়াছে শক্তিশালী বা 'সুপার এল নিনোর।
'এল নিনো' কোনো সাধারণ আবহাওয়াগত ঘটনা নহে। ইহা বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থার একটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক চক্র, যাহা দূরবর্তী প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা পরিবর্তনের মাধ্যমে পৃথিবীর বহু অঞ্চলের আবহাওয়াকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশ সরাসরি প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে অবস্থিত নহে, কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ু ব্যবস্থার সহিত ইহার গভীর সম্পর্ক রহিয়াছে। ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা পরিবর্তনের অভিঘাত শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্র, খাদ্যব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির উপরও পড়িতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করিতেছেন, এইবার যদি শক্তিশালী এল নিনো সক্রিয় হয়, তাহা হইলে বাংলাদেশে বর্ষাকাল বিলম্বিত হইতে পারে, বৃষ্টিপাত কমিতে পারে এবং ঘন ঘন তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। ২০২৪ সালের অভিজ্ঞতা এখনো মানুষের স্মৃতিতে সতেজ। টানা ৩৬ দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৩৬ হইতে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বিরাজ করিয়াছিল। চুয়াডাঙ্গা, রাজশাহী, খুলনা, ঢাকা হইতে ময়মনসিংহ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল যেন অগ্নিগর্ভ ভূমিতে পরিণত হইয়াছিল। স্কুল বন্ধ রাখিতে হইয়াছিল, বিদ্যুতের চাহিদা বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছিল, হাসপাতালে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও ডায়রিয়ার রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়াছিল। এই বাস্তবতা কেবল আবহাওয়ার পরিবর্তনের গল্প নহে-ইহা সামাজিক বৈষম্যেরও নির্মম প্রতিচ্ছবি। প্রচণ্ড গরমে সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, রিকশাচালক এবং নিম্ন আয়ের মানুষ। যাহাদের ঘরে পর্যাপ্ত শীতলীকরণের ব্যবস্থা নাই, যাহাদের কর্মবিরতির সুযোগ নাই-তাহারাই প্রকৃতির এই নির্মমতার প্রথম শিকার হন। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত কেবল পরিবেশগত সংকট নহে, ইহা সামাজিক ন্যায়বিচারেরও প্রশ্ন।
বাংলাদেশের কৃষি খাতের জন্য এই সংকট আরো ভয়াবহ। দেশের আমন ধান বর্ষার পানির উপর নির্ভরশীল, আবার বোরো চাষে প্রয়োজন বিপুল সেচ। বর্ষা বিলম্বিত হইলে আমনের চারা রোপণ ব্যাহত হইবে, দীর্ঘ খরায় জমি শুকাইয়া যাইবে, আবার হঠাৎ অতিবৃষ্টিতে খেত তলাইয়া যাইবে। ফলত খাদ্য উৎপাদন কমিবে, বাজারে চাল, গম ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাইবে। সবচেয়ে বড় আঘাত পড়িবে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনে। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খরাপ্রবণ এলাকাগুলোর ঝুঁকি আরো বাড়িবে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বৃদ্ধি পাইবে, নদী ও খাল-বিল শুকাইয়া যাইতে পারে। আবার উপকূলীয় অঞ্চলে নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমিয়া গেলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাইবে, যাহা কৃষি, পানীয় জল ও মৎস্যসম্পদের জন্য বিপজ্জনক হইয়া উঠিবে। সবচাইতে উদ্বেগজনক বিষয় হইল, বাংলাদেশ এখন একই সঙ্গে দুই বিপরীতমুখী চরম আবহাওয়ার মুখোমুখি দাঁড়াইয়াছে-একদিকে দীর্ঘ তাপপ্রবাহ ও খরা, অন্যদিকে স্বল্পসময়ে অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা। ইহা স্পষ্ট করিয়া দিতেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নহে-ইহা বর্তমানের কঠিন বাস্তবতা।
এই পরিস্থিতিতে কেবল উদ্বেগ প্রকাশ করিলেই চলিবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি। খরা-সহনশীল ফসল উদ্ভাবন, পানি সংরক্ষণ, উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা, নগর ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার এবং স্বাস্থ্য খাতে তাপপ্রবাহ মোকাবিলার বিশেষ প্রস্তুতি এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-জলাশয় দখল এবং পরিবেশ ধ্বংসের প্রবণতাও বন্ধ করিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, প্রকৃতি কখনো প্রতিশোধ লয় না-প্রকৃতি কেবল ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করে। প্রশ্ন হইল-আমরা কি প্রকৃতির এই ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের সতর্কসংকেতকে গুরুত্ব দিব, নাকি 'যেমন চলিতেছে চলুক' মনে করিয়া নিশ্চেষ্ট থাকিব?
