হাম আমাদের আর কতদিন ভোগাইবে?

আপডেট : ২০ মে ২০২৬, ০৩:৫৯

হামে জীবনের বিপর্যয় লইয়া ইত্তেফাক গতকাল দুইটি প্রতিবেদন প্রকাশ করিয়াছে। সংবাদের ছবিগুলির দিকে কিছুক্ষণ তাকাইয়া থাকিলে এবং সংবাদ ক্যাপশন ও শিরোনামগুলি পড়িলে যে কোনো সংবেদনশীল মন বেদনার্ত হইয়া উঠিতে বাধ্য; যেমন—‘বোনের কোলে থাকা শিশু তামজিদ এখন লাইফসাপোর্টে। একই বিছানায় যমজ দুই শিশু রাইসা ও রামিসা। রাইসা লড়ছে হামের বিরুদ্ধে। দুই সন্তানের পাশে অসহায় মা।' আবার খবরের শিরোনামও বড় বেদনাময়—‘লাইফ সাপোর্টে তামজিদ, অশ্রুসজল প্রার্থনায় বাবা-মা । হামে হারানো সন্তানদের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন বাবা-মায়েরা।' শুধু বিভিন্ন পত্রিকার হামসংক্রান্ত খবরের শিরোনাম তুলিয়া দিলেই হয় । ইহা লইয়া এখন আর বেশি কিছু লিখিবার প্রয়োজন হয় না। এক একটি হাম আক্রান্ত পরিবারের এক একটি কাহিনি বড় কষ্টের। যেই সকল গরিব-দুঃখী মা-বাবা শিশুদের চিকিৎসার টাকা জোগাড় করিতে দিগবিদিক ছুটাছুটি করিতেছেন, তাহাদের মনের ভাষা আমরা কতটা পাঠ করিতে পারিতেছি?

চিকিৎসকদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। ইহা দ্রুত ছড়াইয়া পড়ে । এক জন হামে আক্রান্ত রোগী ১২ হইতে ১৮ জনকে সংক্রমিত করিতে পারে। হামের জটিল রূপ হইতেছে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, খিঁচুনিসহ নানা উপসর্গ । গতকাল ইত্তেফাকের অনলাইনের খবরে বলা হইয়াছে যে, দেশে হাম ও হামের উপসর্গ লইয়া মৃত্যু হইয়াছে আরও ১১ শিশুর । ইহার মধ্যে হামের উপসর্গে ৯ জন এবং নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হইয়া দুই শিশুর মৃত্যু হইয়াছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হইয়াছে, গত ১৫ মার্চ হইতে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ লইয়া মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াইয়াছে ৪৭৫ জনে। ইহার মধ্যে ৭৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামে হইয়াছে । একই সময়ে দেশে সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হইয়াছে ১ হাজার ২৬৪ জন । হাসপাতালে ভর্তি হইয়াছে ১ হাজার ১১৫ জন । এই প্রতিবেদন প্রমাণ করে যে, দেশে হাম পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয় নাই ।

এইদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলিয়াছেন যে, অধিকাংশ জেলায় ১০০ হইতে ১০৪ শতাংশ পর্যন্ত হামের টিকার কার্যক্রম সম্পন্ন হইয়াছে । এই পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা শহরে আজ ২০ মে হামের টিকা গ্রহণের শেষ দিন বলিয়া ঘোষণা করিয়াছে সিটি করপোরেশন । তবে ইহার পরও যাহারা টিকা পাইবেন না, তাহাদের প্রয়োজনে খুঁজিয়া খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে এবং টিকা দিতে হইবে । টিকাদান কার্যক্রম নূতন সরকারের সময় বেগবান হওয়াটা আশাব্যঞ্জক। প্রকৃত পক্ষে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশে অস্থিরতা, স্বাস্থ্য প্রশাসনে স্থবিরতা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে হামের টিকা ক্রয় ও সংগ্রহে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে। আশা করি, আমরা শীঘ্রই এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতি হইতে পরিত্রাণ লাভ করিব।

বাংলাদেশ একদা টিকাদান কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করিয়াছিল; কিন্তু হাম পরিস্থিতি আমাদের সেই সাফল্যকে কিছুটা হইলেও ম্লান করিয়া দিয়াছে। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টি জেলাতেই এই মরণব্যাধির সংক্রমণ ছড়াইয়া পড়িতে দেখা গিয়াছে। আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৭৯ শতাংশই পাঁচ বৎসরের কম বয়সি নিষ্পাপ শিশু । সরকারি হিসাবে এই যাবৎ ৩২ সহস্রাধিক মানুষ আক্রান্ত হইয়াছে এই রোগে। নীতিগত ভুল সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক অদূরদর্শিতায় মানবসৃষ্ট কুফল কেমন হইতে পারে, তাহা আমরা এইবার প্রত্যক্ষ করিলাম। এখন জাতীয় এই বিপর্যয় রোধকল্পে অনতিবিলম্বে রাজনৈতিক বিতর্ক ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠিতে হইবে । মনে রাখিতে হইবে, শিশুদের জীবন লইয়া ছিনিমিনি খেলিবার অধিকার কাহারও নাই । তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সব সময় দ্রুত ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই বাঞ্ছনীয় ।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন