গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির একটি এজেন্ট ব্যাংকিং শাখার সঞ্চয়ী হিসাবধারী ও এফডিআর গ্রাহকদের দুই কোটি টাকার হিসাব না পাওয়ায় আমানতকারীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। উপজেলার ধাপেরহাটে অবস্থিত এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট শাখায় এ ঘটনা ঘটেছে।
এ ঘটনায় রোববার (২৬ জুলাই) বিকেল থেকে দিবাগত রাত ১টা পর্যন্ত ওই এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট শাখায় শত শত গ্রাহক ভিড় জমান। এক পর্যায়ে শাখায় কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবরুদ্ধ করে রাখেন তারা। পরে পুলিশ এসে অবরুদ্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্ধার করে ধাপেরহাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে নিয়ে যায়।
পুলিশ, আমানতকারী, এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট স্বত্বাধিকারী ও এলাকাবাসী জানান, সম্প্রতি রেশমা বেগম নামে একজন গ্রাহক ওই শাখায় তার ফিক্সড ডিপোজিট করে রাখা ৫ লাখ টাকা তুলতে আসেন। তখন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে জানান তার অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই। পরে বিষয়টি সমাধানের জন্য তাকে রোববার আসতে বলেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে রোববার একে একে প্রায় অর্ধশত গ্রাহক এসে জানতে পারেন তাদের নামে এ শাখায় কোন এফডিআর করা হয় নেই। এসময় তারা টাকা জমা রশিদ ও এফডিআর চেক দেখান।
তখন ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই জমা রশিদ ও এফডিআর চেকগুলো নকল। অন্যদিকে ব্যাংকের ওই শাখার সঞ্চয়ী হিসাবধারী একাধিক গ্রাহক এসে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন তাদের অ্যাকাউন্টে জমা থাকা টাকার পরিমাণেও বিশাল গড়মিল। পরে ভুক্তভোগী গ্রাহকরা ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত অবরুদ্ধ করে রাখে। খবর পেয়ে রাত ১টার দিকে পুলিশ এসে অবরুদ্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্ধার করে ধাপেরহাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে নিয়ে যায়।
রেশমা বেগম নামে এক গ্রাহক জানান, প্রায় ৩ বছর আগে এই শাখা তিনি ৫ লাখ টাকা (৫ বছর মেয়াদী) ফিক্সড ডিপোজিট করেন। সম্প্রতি তার টাকার প্রয়োজন হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার ওই টাকা তুলতে আসেন। ব্যাংকে এসে জানতে পারেন তার অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই। তখন তিনি টাকা জমা রশিদ ও এফডিআর চেক দেখালে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ রোববার আসতে বলেন। রোববার এসে জানতে পারেন এই জমা রশিদ ও এফডিআর চেক ভুয়া।
ওই শাখার অপর এক গ্রাহক হেলাল মন্ডল জানান, প্রায় ৩ বছর আগে তিনি এ শাখায় ৪ লাখ টাকা এফডিআর করেন। এ খবর পেয়ে রোববার ব্যাংকে এসে জানতে পারেন তার নামে এ শাখায় কোনো টাকা এফডিআর করা হয়নি।
তিনি আরও জানান, এ খবর ছড়িয়ে পড়লে রোববার মুহূর্তের মধ্যে প্রায় অর্ধশত গ্রাহক ব্যাংকে ভিড় করেন। তাদের কাছে থাকা টাকা জমা রশিদ ও এফডিআর চেক ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে দেখালে তারা জানান এসব ভুয়া।
লাজু মন্ডল নামে এক গ্রাহক জানান, তিনি তার সঞ্চয়ী হিসেবে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা জমা রেখেছেন। সম্প্রতি তিনি এই টাকা থেকে মাত্র এক লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন। রোববার খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন তার অ্যাকাউন্টে এখন মাত্র এক হাজার টাকা জমা রয়েছে।
এজেন্ট ব্যাংকিং শাখার স্বত্বাধিকারী মো. ওয়ালিউর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, তার শাখার ক্যাশিয়ার মো. সবুজ মিয়া ও অফিস সহায়ক মো. মাহবুল ইসলাম যৌথভাবে ৪৬ জন গ্রাহকের সঙ্গে এসব অপকর্ম করেছেন। দুই কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। আগামী এক মাসের মধ্যে গ্রাহকদের এই টাকা তারা ফেরত দেওয়া হবে।
ধাপেরহাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক মতিউল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, গ্রাহকদের খোয়া যাওয়া টাকা এক মাসের মধ্যে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ফেরত দিবেন। গ্রাহক ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষের মধ্যে এই শর্তে বিষয়টি প্রাথমিকভাবে সমাধান হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
এজেন্ট ব্যাংকিং শাখা নিয়ন্ত্রণকারী ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পীরগঞ্জ (রংপুর) শাখার ব্যবস্থাপক মো. হাদিউল ইসলাম জানান, অফিস সহায়ক মাহবুল ইসলাম সহায়তায় ওই শাখার ক্যাশিয়ার মো. সবুজ মিয়া এফডিআর করতে আসা গ্রাহকদের আবেদন ফরম পূরণ করায় টাকা নেওয়ার পর ভুয়া স্লিপ এবং স্ক্যান করা এফডিআর চেক দেন।
তিনি আরও জানান, শুধু তাই নয় এসব গ্রাহকদের তিনি প্রতি মাসে লাভের টাকাও প্রদান করেছেন। এছাড়া সঞ্চয়ী হিসাবধারী গ্রাহকরা টাকা উত্তোলন করতে আসলে তাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে তিনি নয়-ছয়ও করেছেন। তবে গ্রাহকরা যাতে তাদের আমানতের টাকা ফেরত পান। সে ব্যাপারে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

