জন্মের পর থেকেই মানুষ পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও রক্তের সম্পর্কের এক চিরচেনা ভূগোলে বেড়ে ওঠে। কিন্তু জীবনযাত্রার কোনো এক মোড়ে দাঁড়িয়ে হঠাৎ করেই এমন একজন মানুষের আগমন ঘটে, যার সঙ্গে রক্তের কোনো টান নেই। অথচ জীবনের সবচেয়ে গোপন কথা, আনন্দ আর বেদনার মুহূর্তগুলো তার কাছেই অবলীলায় প্রকাশ করা যায়।
সামাজিক কোনো বাধ্যবাধকতা বা জন্মসনদ ছাড়াই গড়ে ওঠা এই সম্পর্কের নামই বন্ধুত্ব। মানুষের তৈরি যাবতীয় সম্পর্কের মধ্যে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে স্বাধীন এবং গভীর।
আজ আগস্ট মাসের প্রথম রোববার। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে দিনটি পালিত হচ্ছে ‘বন্ধু দিবস’ হিসেবে। যদিও এমন একটি সম্পর্ককে নির্দিষ্ট কোনো দিন বা তারিখে বেঁধে রাখা যায় না। তারপরও এই দিনটি পুরোনো বন্ধুদের খোঁজ নেওয়া, স্মৃতি রোমন্থন কিংবা সম্পর্ককে নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার একটি উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বন্ধুত্বের এই গভীরতা ও মাহাত্ম্য যুগে যুগে উঠে এসেছে বিখ্যাত সব মনীষীদের কথায়। বিখ্যাত গল্পকার মারিও পুজো যেমন বন্ধুত্বকে প্রতিভার চেয়ে বড় এবং পরিবারের প্রায় সমতুল্য মনে করেছেন, তেমনি আইনস্টাইনের মতে সত্যিকারের ভালোবাসা যেমন দুর্লভ, খাঁটি বন্ধুত্ব তার চেয়েও বিরল। রবার্ট লুইস স্টিভেনসন বা আলবেয়ার কামুর মতো চিন্তাবিদরা মনে করেন, কোনো শর্ত বা নেতৃত্ব ছাড়া পাশাপাশি হাঁটার নামই বন্ধুত্ব। অন্যদিকে আলবার্ট কামু একে ভালোবাসারই একটি রূপ বলেছেন এবং এরিস্টটলের দৃষ্টিতে বন্ধু হলো নিজেরই আরেক সত্তা।
কীভাবে এলো বন্ধু দিবস?
বন্ধু দিবসের ইতিহাস নিয়ে একাধিক মত রয়েছে। ধারণা করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৩০ সালে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে বন্ধু দিবস পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় হলমার্ক কার্ডের প্রতিষ্ঠাতা হাওয়ার্ড হল ২ আগস্টকে বন্ধু দিবস হিসেবে ঘোষণা করে বন্ধুদের শুভেচ্ছা কার্ড, ফুল ও উপহার বিনিময়ের প্রচার চালান। তবে ক্রেতাদের আগ্রহ কম থাকায় সেই উদ্যোগ খুব বেশি সফল হয়নি।
পরবর্তীকালে ১৯৩৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস আগস্ট মাসের প্রথম রবিবারকে ‘জাতীয় বন্ধু দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর ধীরে ধীরে দিনটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
আরেকটি প্রচলিত মত অনুযায়ী, ১৯৩৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একটি ঘটনার প্রতিবাদে এক ব্যক্তি তার বন্ধুর মৃত্যুর পরদিন আত্মহত্যা করেন। সেই আত্মত্যাগের স্মরণে আগস্টের প্রথম রবিবারকে বন্ধু দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়েও বন্ধু দিবস জনপ্রিয় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৫৮ সালে সেখানে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধু দিবস উদযাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বন্ধু দিবস পালনের প্রস্তাবও আসে প্যারাগুয়ে থেকেই।
২০১১ সালের ২৭ জুলাই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ প্রতি বছরের ৩০ জুলাইকে ‘আন্তর্জাতিক বন্ধু দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এখনও বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে আগস্টের প্রথম রবিবারই বন্ধু দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়।
বন্ধুত্বের এই গভীরতা ও মাহাত্ম্য যুগে যুগে উঠে এসেছে বিখ্যাত সব মনীষীদের কথায়। বিখ্যাত গল্পকার মারিও পুজো যেমন বন্ধুত্বকে প্রতিভার চেয়ে বড় এবং পরিবারের প্রায় সমতুল্য মনে করেছেন, তেমনি আইনস্টাইনের মতে সত্যিকারের ভালোবাসা যেমন দুর্লভ, খাঁটি বন্ধুত্ব তার চেয়েও বিরল। রবার্ট লুইস স্টিভেনসন বা আলবেয়ার কামুর মতো চিন্তাবিদরা মনে করেন, কোনো শর্ত বা নেতৃত্ব ছাড়া পাশাপাশি হাঁটার নামই বন্ধুত্ব। অন্যদিকে আলবার্ট কামু একে ভালোবাসারই একটি রূপ বলেছেন এবং এরিস্টটলের দৃষ্টিতে বন্ধু হলো নিজেরই আরেক সত্তা।
বদলে গেছে উদযাপনের ধরন
একসময় বন্ধু দিবসে শুভেচ্ছা কার্ড, চকলেট কিংবা ছোট উপহার বিনিময়ের প্রচলন ছিল। এখন সেই জায়গা অনেকটাই দখল করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। পুরোনো ছবির কোলাজ, স্মৃতিচারণ, বন্ধুদের উদ্দেশে শুভেচ্ছাবার্তা কিংবা আড্ডার ছবি শেয়ার করেই দিনটি উদযাপন করেন অনেকেই।
কেন প্রয়োজন বন্ধুত্ব?
মনোবিশ্লেষকদের মতে, বন্ধুত্ব শুধু বন্ধুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; জীবনের প্রায় সব সম্পর্কেই বন্ধুত্বের প্রয়োজন রয়েছে। বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্ক কিংবা দাম্পত্য সম্পর্কেও বন্ধুত্ব থাকলে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বিশ্বাস আরও গভীর হয়।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বলেন, আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা মানুষকে ধীরে ধীরে একাকী করে তুলছে। এই বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি কাটিয়ে উঠতে আন্তরিক বন্ধুত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন, বন্ধুহীন মানুষ নানা ধরনের মানসিক সমস্যায় ভুগতে পারে। মানুষের জীবনে এমন একজন প্রয়োজন, যার কাছে নিজের কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, যে অন্যের সমস্যাকে নিজের সমস্যা হিসেবে দেখবে। এমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক মানুষকে একাকিত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে এবং মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে সহায়তা করে।
জীবনে মানুষের আনাগোনা চলতেই থাকে। সময়ের নিয়মে অনেক সম্পর্ক ফিকে হয়ে যায়, অনেকে হারিয়ে যায় স্মৃতির অতলে। কিন্তু সত্যিকারের বন্ধুরা রয়ে যায় জীবনের শেষ অবধি- কখনো পাশাপাশি থেকে, কখনো দূরে অবস্থান করে আবার কখনো নিছক একবুক মিষ্টি স্মৃতি হয়ে। জীবনে নিজের সত্তাকে উন্মুক্ত করার এবং পৃথিবীকে নতুন আলোয় দেখার অনুপ্রেরণা যোগায় এই বন্ধন। আগস্টের প্রথম রবিবার বা জাতিসংঘের ঘোষিত আন্তর্জাতিক দিবস যাই হোক না কেন, বন্ধুত্ব প্রতিদিনের, বন্ধুত্ব চিরকালের।
বিশ্ব বন্ধু দিবস শুধু শুভেচ্ছা বিনিময়ের একটি দিন নয়, বরং প্রিয় বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরও একটি উপলক্ষ। তাহলে চলুন জেনে নেয়া যাক, ছোট ছোট কোন উদ্যোগে দীর্ঘদিনের এই সুন্দর সম্পর্ককে আরও দৃঢ় রাখা যায়।
মন খুলে কথা বলুন, যোগাযোগ রাখুন
বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়মিত যোগাযোগ। ব্যস্ততার কারণে প্রতিদিন কথা বলা সম্ভব না হলেও মাঝে মাঝে খোঁজ নেয়া, বন্ধুর কথা মন দিয়ে শোনা এবং তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেয়া জরুরি। অনেক সময় একটি ছোট্ট বার্তা বা হঠাৎ করা একটি ফোনকলও বন্ধুকে বুঝিয়ে দেয় যে আপনি তাকে এখনও আগের মতোই গুরুত্ব দেন।
বিশেষ দিন ও মুহূর্ত মনে রাখুন
বন্ধুর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো মনে রাখা সম্পর্ককে আরও গভীর করে। জন্মদিন, নতুন কোনো অর্জন কিংবা জীবনের বিশেষ কোনো দিনে শুভেচ্ছা জানানো বন্ধুত্বে বাড়তি উষ্ণতা যোগ করে। পুরোনো ছবি, স্মৃতি কিংবা একসঙ্গে কাটানো সময়ের গল্প ভাগ করে নেওয়াও বন্ধুত্বকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
সুখ-দুঃখে পাশে থাকুন
সত্যিকারের বন্ধুত্ব শুধু আনন্দের সময় একসঙ্গে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জীবনের কঠিন সময়ে একজন বন্ধুর পাশে দাঁড়ানোই বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় পরিচয়। বন্ধুর সমস্যা সমাধান করতে না পারলেও তার কথা মন দিয়ে শোনা, সাহস দেয়া এবং মানসিকভাবে পাশে থাকাই অনেক বড় সমর্থন হয়ে ওঠে।
ছোট ছোট যত্নে প্রকাশ করুন ভালোবাসা
বন্ধুত্ব ধরে রাখতে সব সময় বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। হঠাৎ বন্ধুর খোঁজ নেয়া, তার পছন্দের কোনো জিনিস মনে রাখা, ছোট কোনো উপহার দেয়া কিংবা একসঙ্গে কিছু সময় কাটানো এসব ছোট ছোট উদ্যোগই সম্পর্ককে দীর্ঘদিন সতেজ রাখে।
একে অপরের পার্থক্যকে সম্মান করুন
প্রত্যেক মানুষের চিন্তা, পছন্দ, মতামত ও জীবনযাপনের ধরন আলাদা। বন্ধুত্বের সৌন্দর্য হলো এই ভিন্নতাকে গ্রহণ করা। মতের অমিল হলেও বন্ধুর প্রতি সম্মান বজায় রাখা এবং তার অবস্থান বোঝার চেষ্টা করাই একটি পরিণত বন্ধুত্বের পরিচয়।
শুধু অনলাইনে নয়, বাস্তবেও সময় দিন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে দূরে থাকা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এখন সহজ হয়েছে। তবে শুধু লাইক, কমেন্ট বা মেসেজের মধ্যেই বন্ধুত্ব সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। সুযোগ পেলেই একসঙ্গে সময় কাটানো, সরাসরি কথা বলা এবং বাস্তব মুহূর্ত ভাগ করে নেয়া সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে।
বিশ্বাস ও গোপনীয়তা বজায় রাখুন
একজন ভালো বন্ধুর সবচেয়ে বড় গুণ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। বন্ধুর ব্যক্তিগত কথা গোপন রাখা, তার দুর্বলতাকে সম্মান করা এবং প্রয়োজনের সময় পাশে থাকা বন্ধুত্বের ভিত্তিকে আরও মজবুত করে।
বন্ধুত্ব কোনো একদিনের উদ্যাপন নয়, বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট যত্নে তৈরি হওয়া এক সুন্দর সম্পর্ক। বিশ্বাস, সম্মান ও আন্তরিকতার মাধ্যমে এই বন্ধন আজীবন ধরে রাখা সম্ভব।

