সংসারের স্বার্থে বিসর্জন দিয়েছিলেন পড়াশোনা, ৫৪ বছরে পাশ করলেন এসএসসি

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৮

‘বয়স কেবল একটা সংখ্যা’ ইচ্ছে থাকলে কোনো বাধা হতে পারে না। এ কথাই যেন প্রমাণ করেছেন নাটোরের বাগাতিপাড়ার আলী আকবর। ৫৪ বছর বয়সে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৪.৩৫ পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি।

জীবনের বড় একটি সময় কেটেছে সংসারের অভাব-অনটন আর সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার সংগ্রামে। নিজের পড়াশোনার স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সেই স্বপ্নই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আবার জাগিয়ে তুলেছেন তাকে। 

আলী আকবর বাগাতিপাড়া পৌরসভার পেড়াবাড়িয়া মহল্লার মোল্লা শেখ খোকার ছেলে। স্থানীয়ভাবে তার ডাকনাম আলী আজম।

রাজশাহীতে চাকরির সুবাদে নওহাটা সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি হাই স্কুলের কারিগরি শাখায় ভর্তি হয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। প্রথমবারেই কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে এলাকায় সাড়া ফেলেছেন।

আলী আকবর জানান, অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে তার জন্ম। তারা কয়েক ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। সংসারের অভাব-অনটনের কারণে ছোটবেলাতেই লেখাপড়া ছেড়ে বাবার সঙ্গে পরিবারের হাল ধরতে হয় তাকে। পরবর্তী সময়ে বিয়ে হয়। সংসারে আসে এক মেয়ে ও এক ছেলে। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাতে গিয়ে তাকে আরও কঠিন সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হয়।

একপর্যায়ে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রাজশাহীর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে কর্মচারী পদে চাকরিতে যোগ দেন আলী আকবর। স্বামী-স্ত্রীর উপার্জনের অর্থ দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যান। তার বড় মেয়ে নার্সিং পেশায় যুক্ত হয়েছেন এবং ছোট ছেলে ইসমাইল হোসেন এমবিবিএস ডাক্তার হয়ে বর্তমানে সরকারি চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত।

আলী আরও আকবর বলেন, সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে নিজের পড়াশোনার ইচ্ছেটাকে বিসর্জন দিয়েছিলাম। মেয়েকে নার্স ও ছেলেকে ডাক্তার বানিয়েছি। এখন তারা নিজ নিজ জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। তাই মনে হলো, জীবনের বাকি সময়টুকু আর বসে না থেকে নিজের অপূর্ণ স্বপ্নটাও পূরণ করি।

তিনি বলেন, আবার পড়াশোনা শুরু করলাম। এরপর ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিই। আলহামদুলিল্লাহ, প্রথমবারেই জিপিএ-৪.৩৫ পেয়ে পাস করেছি। এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

বর্তমান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আলী আকবর বলেন, পড়াশোনার জন্য কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। পরীক্ষায় ভালো করতে হলে প্রয়োজন মনোবল, মনোযোগ ও পরিশ্রম। অযথা মোবাইল গেম ও বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে আড্ডায় সময় নষ্ট না করে পড়াশোনায় মনোযোগ দিলে ভালো ফলাফল করা সম্ভব। আমি নিজেই তার প্রমাণ।

আলী আকবরের ছেলে ডাক্তার ইসমাইল হোসেন বলেন, বাবা প্রায়ই বলতেন, তার পড়াশোনার খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু পারিবারিক অভাব-অনটন এবং আমাদের প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্বের কারণে তিনি নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়েছিলেন। এখন আমি একজন ডাক্তার, আমার স্ত্রীও ডাক্তার। আমার বড় বোন নার্সিং পেশায় আছেন এবং বোন জামাই শিক্ষকতা করেন।

তিনি আরও বলেন, বাবার সেই অপূর্ণ স্বপ্নের কথা আমরা জানতাম। তাই তাকে স্কুলে ভর্তি করি। এবার তিনি এসএসসি পাস করেছেন। সামনে তাকে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি করানোর ইচ্ছা রয়েছে। তিনি তার বাবার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চান।

এ বিষয়ে ওই পেড়াবাড়িয়া মহল্লার সাবেক কমিশনার আবু হেনা মো. কামরুজ্জামান বলেন, ৫৪ বছর বয়সে আলী আকবরের এসএসসি পাসের ঘটনা আমাদের জন্য গর্বের। এই বয়সে এসে পড়াশোনা করে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়া অদম্য ইচ্ছাশক্তি, মনোবল ও অধ্যবসায়ের প্রমাণ। তার এই সাফল্য এলাকার তরুণ প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণার। পেড়াবাড়িয়া মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে তাকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভকামনা জানান।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

ইত্তেফাক/পিএস