২৮ লাখ টাকার কালভার্টে নেই ওঠার রাস্তা, পানিতে দুর্ভোগ দেড় হাজার মানুষের

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ২১:৪৮

বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার রাড়ীপাড়া ইউনিয়নের কাকার বিল এলাকায় ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত কালভার্টটি চার মাস পেরিয়ে গেলেও তৈরি হয়নি সংযোগ সড়ক। ফলে কালভার্ট নির্মাণ শেষ হলেও সেটি ব্যবহার করতে পারছেন না স্থানীয়রা। এক পাশে কিছু বালু ফেলা হলেও অন্য পাশে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি থাকায় প্রতিদিন পানির মধ্য দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে পাঁচ গ্রামের প্রায় দেড় হাজার মানুষকে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মধ্যম তেলিগাতি-মালমগাছা-ব্রাহ্মণকাঠি-কাকারবিল সড়কের কাকার বিল এলাকায় নির্মিত কালভার্টটির দুই পাশে ওঠার মতো কোনো সংযোগ সড়ক নেই। বর্ষার পানিতে সড়কের দুই পাশ তলিয়ে গেছে। বিকল্প পথ না থাকায় স্থানীয় বাসিন্দা, স্কুলশিক্ষার্থী, শিক্ষক, নারী ও বয়স্কদের ঝুঁকি নিয়ে পানি পেরিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, সড়কের চেইনেজ ৩১৪৯ মিটারে ৫ মিটার × ৩ দশমিক ৫০ মিটার আরসিসি বক্স কালভার্টটি নির্মাণ করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ২৮ লাখ ২৯ হাজার ৮০১ টাকা ১৯ পয়সা। কাজটি বাস্তবায়ন করছে এলজিইডি।

স্থানীয়রা জানান, বৌবাজার থেকে চুচড়ামারি খাল পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কের চেইনেজ ৩১৪৯ মিটারে কালভার্টটি নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এর দুই পাশে এখনো সংযোগ সড়ক তৈরি হয়নি। ফলে নির্মাণের পরও কালভার্টটি কার্যত ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে আছে।

কাকার বিল, খাড়াসম্বল, চুচড়ামারি, মালমগাছা, ঢুলিগাতী ও বৈলতলীসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ এ সড়ক ব্যবহার করেন। প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড় হাজার মানুষ এ পথে চলাচল করেন। কাছেই রয়েছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মসজিদ। কালভার্টে ওঠার ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদেরও পানি মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে।

তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তানহা বলে, ‘প্রতিদিন স্কুলে যেতে হয়। কালভার্ট তৈরি হলেও আমরা উঠতে পারি না। পাশের খাল পার হয়ে যেতে হয়। মা আমাকে প্রতিদিন স্কুলে নিয়ে যান এবং নিয়ে আসেন। দ্রুত রাস্তা সংস্কার করে কালভার্টের দুই পাশে বালু দিয়ে ভরাট করে ওঠার ব্যবস্থা করা হলে আমরা সহজে স্কুলে যেতে পারতাম।’

একই শ্রেণির শিক্ষার্থী তোবা বলে, ‘আমরা এই খাল পার হতে পারি না। খুব কষ্ট হয়। স্কুলে যেতেও ভিজতে হয়, আসতেও ভিজতে হয়। আমরা দ্রুত এর সমাধান চাই।’

স্থানীয় বাসিন্দা সাবিনা আক্তার বলেন, তার দুই সন্তান স্কুলে পড়ে। একজনকে সকাল ৯টায় এবং আরেকজনকে দুপুর ১২টায় স্কুলে নিয়ে যেতে হয়। ফলে প্রতিদিন চারবার পানির মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে হয় তাকে। কিছুদিন আগে পানিতে পড়ে তার সন্তানের বই-খাতাও ভিজে গেছে।

মনিরা বেগম বলেন, বৃষ্টির কারণে রাস্তার অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। কালভার্ট তৈরি হলেও সেটি দিয়ে ঠিকমতো চলাচল করা যাচ্ছে না।

স্থানীয় বাসিন্দা জাকির হোসেন বলেন, ‘এই কালভার্ট দিয়ে পাঁচ গ্রামের মানুষ চলাচল করে। প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড় হাজার মানুষকে পানিতে ভিজে যাতায়াত করতে হয়। বাজারে যেতে হলেও এই কালভার্ট পার হতে হয়। নির্মাণের প্রায় চার মাস হয়ে গেলেও ঠিকাদারকে বারবার বলেও কোনো কাজ হচ্ছে না।’

তিনি বলেন, কালভার্ট নির্মাণের সময় বিকল্প চলাচলের ব্যবস্থা করার কথা থাকলেও ঠিকাদার তা করেননি। বাধ্য হয়ে স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে বাড়ির ভেতর দিয়ে একটি অস্থায়ী পথ তৈরি করেছেন। সেই পথ দিয়েই শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সবাই চলাচল করছেন। কোথাও কোথাও পানি কোমর পর্যন্ত উঠে যায়।

রাড়ীপাড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর কাকার বিল ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মনি শিকদার বলেন, ‘তিন-চার মাস আগে খালের ওপর কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এরপর ঠিকাদার কাজ ফেলে চলে গেছেন। কালভার্টের দুই পাশে মাটি দেওয়া হয়নি, বিকল্প রাস্তাও নেই। প্রতিদিন দেড় হাজারের মতো মানুষ এ পথ দিয়ে চলাচল করে। এখানে স্কুল ও মসজিদ রয়েছে। ছোট ছোট শিশুরা পানির মধ্যে দিয়ে স্কুলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। দ্রুত কালভার্টের দুই পাশে মাটি ভরাট করে চলাচলের ব্যবস্থা করা দরকার।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, কালভার্ট নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত বিকল্প চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় কাজ শেষ হওয়ার পরও দুর্ভোগ কমেনি। বরং বর্ষায় পানি বেড়ে পরিস্থিতি আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

তবে ঠিকাদার মো. জালাল খান বলেন, ‘আমি ঢাকায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় কাজে কিছুটা দেরি হয়েছে। দ্রুত বাগেরহাট গিয়ে কাজটি শেষ করে দেব। নতুন করে রাস্তার কাজ শুরু হয়েছে। রাস্তার কাজ শেষ হলেই মাটি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এ ছাড়া কিছুদিনের মধ্যে গ্রামবাসী ও শিক্ষার্থীদের চলাচলের জন্য একটি সাঁকো নির্মাণ করা হবে। সেখান থেকে মাটি এনে কালভার্টের দুই পাশে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।’

এ বিষয়ে বাগেরহাট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মঞ্জুর রশিদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

স্থানীয়দের দাবি, কালভার্টের দুই পাশে দ্রুত মাটি ও বালু দিয়ে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করা হোক। বিশেষ করে স্কুলশিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত কাজ শেষ করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

ইত্তেফাক/এমএএম