গ্যাস-বিদ্যুৎসংকট ঝুঁকি বাড়াচ্ছে উৎপাদন ও রপ্তানি খাতের

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩০

গ্যাস ও বিদ্যুত্সংকটে দেশের শিল্প খাতে উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। বড় শিল্পগোষ্ঠী থেকে শুরু করে টেক্সটাইল, ডাইং, পোশাক, ইস্পাত, খাদ্য ও নিত্যপণ্য উত্পাদনকারী কারখানাগুলোতে কমেছে উত্পাদন। কোথাও কারখানা বন্ধ, কোথাও সক্ষমতার অর্ধেকেরও নিচে উত্পাদন চলছে। এর প্রভাব পড়ছে উত্পাদন ব্যয়, রপ্তানি আদেশ, কর্মসংস্থান ও বাজারে পণ্যের সরবরাহে।

সামপ্রতিক সময়ে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ একপর্যায়ে প্রায় ১ হাজার ৯৩০ মিলিয়ন ঘনফুটে (১৯৩ কোটি ঘনফুট) নেমে এসেছিল। ঐ সময় দৈনিক চাহিদা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট বা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। অর্থাত্ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ছিল প্রায় অর্ধেক। পরে এলএনজি সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও গ্যাসের মোট প্রাপ্যতা চাহিদার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম রয়েছে।

দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপের ৫৭টি কারখানা গত ১০ আগস্ট রাত থেকে গ্যাস ও বিদ্যুত্ সংকটে বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন গ্রুপটির চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল। চিনি, ভোজ্য তেল, গম, আটা, ময়দা, সুজি, সিমেন্ট, কাগজ, এলপিজি ও ফিডসহ বিভিন্ন পণ্য উত্পাদন করে প্রতিষ্ঠানটি। টি কে গ্রুপের প্রায় ২০টি কারখানাও বন্ধ রয়েছে। নাবিল গ্রুপের বিভিন্ন কারখানায় উত্পাদন সক্ষমতা নেমে এসেছে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশে। বিএসআরএমেরও ১০টি প্রধান কারখানা বন্ধ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেও সংকটের চিত্র তীব্র। হবিগঞ্জে ১৭১টি কারখানা কয়েক দিন পুরোপুরি বন্ধ থাকার তথ্য এসেছে। নরসিংদী-মাধবদী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলেও গ্যাসের কম চাপের কারণে উত্পাদন ব্যাহত হয়েছে। টেক্সটাইলশিল্পে প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না থাকায় উত্পাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান বাবলু ইত্তেফাককে বলেন, বর্তমানে জ্বালানি সংকট একটি চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বায়াররাও আমাদের জ্বালানি বিষয়গুলো নিয়ে খোঁজ রাখছেন। অর্ডারের আগে তাদের জিজ্ঞাসা থাকে যে—আমরা পণ্য শিপম্যান্ট করতে পারব কি না। তেলের সমস্যা না থাকায় আমাদের গার্মেন্টসগুলোতে তেমন একটা সমস্যা হচ্ছে না। তবে স্প্যানিং মিলগুলোতে সমস্যা হচ্ছে। আমরা আশাবাদী দ্রুতই সরকার এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন।’

সংকটের কারণ

বর্তমান সংকটের তাত্ক্ষণিক কারণগুলোর একটি মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে সরবরাহ-বিঘ্ন। ২১ জুলাই আগুনে টার্মিনালের বৈদ্যুতিক কেবল ব্যবস্থার ক্ষতি হলে এটি দুই সপ্তাহের বেশি সময় বন্ধ থাকে। এতে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। পরে একটি রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট আংশিক চালু হলে প্রায় ১১.৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়।

এলএনজি সরবরাহে আবহাওয়াজনিত বিঘ্নও হয়েছে। জুলাইয়ের শুরুতে বৈরী আবহাওয়ার কারণে একটি এলএনজি কার্গো টার্মিনালে ভিড়তে না পারায় সরবরাহ প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট কমে যায়। ঐ সময় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৫৩ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুটের মতো, বিপরীতে সরকারি চাহিদা ছিল প্রায় ৩৮৫ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট।

তবে বর্তমান সংকটের ভিত্তি আরো দীর্ঘমেয়াদি। দেশীয় গ্যাস উত্পাদন কমছে এবং গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। ফলে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। একটি সামপ্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে দৈনিক দেশীয় গ্যাস উত্পাদন প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট থাকলেও গত এক দশকে তা ১০০ কোটির বেশি কমেছে। বর্তমানে দেশীয় উত্পাদন ও এলএনজি মিলিয়ে সর্বোচ্চ সরবরাহ প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট।

গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব বিদ্যুত্ উত্পাদনে :গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব পড়ছে বিদ্যুত্ উত্পাদনেও। জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে একপর্যায়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুত্ উত্পাদন ৪ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়। পরে গ্যাস সরবরাহ বাড়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্রগুলো সর্বোচ্চ প্রায় ৫ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট উত্পাদনে ফিরতে পারে।

ফলে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি একই সঙ্গে শিল্পের ওপর চাপ তৈরি করছে। গ্যাসের অভাবে বয়লার, চুল্লি ও উত্পাদনযন্ত্র স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। আবার বিদ্যুত্ না থাকলে উত্পাদন লাইন বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

বাড়ছে উত্পাদন ব্যয় :বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উত্পাদন চালু রাখার চেষ্টা করছেন কিছু উদ্যোক্তা। এতে সরাসরি বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়। শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ডিজেল ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

টেক্সটাইল খাতেও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে। একটি শিল্পভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার পর অনেক টেক্সটাইল কারখানায় প্রয়োজনীয় ৮ পিএসআই চাপের বিপরীতে মাত্র ২ থেকে ৩ পিএসআই চাপ পাওয়া গেছে।

রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের ঝুঁকি :গ্যাসসংকটের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে। সুতা উত্পাদন থেকে ডাইং ও ফিনিশিং- প্রতিটি ধাপ পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। একটি ধাপ বন্ধ হলে পরবর্তী ধাপেও উত্পাদন ব্যাহত হয়। এতে সময়মতো রপ্তানি আদেশ পূরণ করা কঠিন হতে পারে।

তবে সংকটের প্রভাব শুধু রপ্তানিমুখী শিল্পে সীমাবদ্ধ নয়। চিনি, ভোজ্য তেল, আটা, ময়দা, সুজি ও ফিডের মতো নিত্যপণ্য উত্পাদনেও গ্যাস ও বিদ্যুত্ প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় উত্পাদন কম থাকলে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

প্রয়োজন পূর্বানুমানযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ :শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, সংকটের সময়ে রেশনিং প্রয়োজন হলে সেটি পরিকল্পিতভাবে করা যেতে পারে। তবে কোন এলাকায় কখন গ্যাসের চাপ কমবে, তার একটি পূর্বানুমানযোগ্য সময়সূচি থাকা জরুরি। এতে উদ্যোক্তারা উত্পাদন, শ্রমিকের কর্মঘণ্টা এবং রপ্তানি চালানের পরিকল্পনা করতে পারবেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তাত্ক্ষণিক সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্পাদন বাড়ানো, এলএনজি আমদানি ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা জোরদার এবং জ্বালানির উত্স বহুমুখীকরণ জরুরি।

বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, একটি এলএনজি টার্মিনালে বড় ধরনের সরবরাহ-বিঘ্ন হলে তার প্রভাব শুধু গ্যাস খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বিদ্যুত্ উত্পাদন, শিল্পের উত্পাদন, রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং বাজার সরবরাহ সব ক্ষেত্রেই তার প্রভাব পড়ে। তাই তাত্ক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে একটি নির্ভরযোগ্য ও বহুমুখী জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

ইত্তেফাক/এএম