মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলছে, তার ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে মূল্যায়ন করা উচিত। বৃহস্পতিবার ‘সৈয়দ হুমায়ুন কবির মেমোরিয়াল রিসার্চ সিম্পোজিয়াম ২০২৬’-এ বক্তারা এ কথা বলেন। তাঁরা তথ্য-প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়ন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈষম্য নিরসনে অধিকতর মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
ভার্চুয়ালি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক কৌশিক বসু বলেন, ন্যায্যতা, ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু বলেন, “জিডিপিই একমাত্র সূচক নয়; আসল প্রশ্ন হলো—কীভাবে অগ্রগতি জনকল্যাণে বা মানুষের মঙ্গলে রূপান্তরিত হয়।”
তিনি সতর্ক করেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উত্থান নতুন ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে; ফলে অগ্রগতির সুফল কারা ভোগ করছে—সেই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
‘বাংলার পাঠশালা ফাউন্ডেশন’-এর সহযোগিতায় ঢাকা শেরাটন হোটেলে দিনব্যাপী এই সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করে ‘সাজেদা ফাউন্ডেশন’। “ন্যায়বিচার, সক্ষমতা ও জনকল্যাণ: একটি অধিকতর ন্যায়পরায়ণ বাংলাদেশের জন্য মানব উন্নয়নকে নতুন করে ভাবা”—এই প্রতিপাদ্যকে কেন্দ্র করে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গবেষক, নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ ও উন্নয়নকর্মীরা যোগ দেন। তাঁরা আলোচনা করেন, কীভাবে গবেষণালব্ধ জ্ঞান বিভিন্ন কর্মসূচি ও জাতীয় নীতি প্রণয়নে সহায়তা করতে পারে।
সাজেদা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ফারুক সোবহান প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাকালীন মূল্যবোধগুলো ধরে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “নেতৃত্ব, জবাবদিহিতা এবং ফলাফল-ভিত্তিক ও মেধা-নির্ভর কাঠামোর মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের আস্থা অর্জন করে।”
সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান বলেন, সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের জন্য সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, “সরকারি সেবার মান বাড়াতে হলে আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত আরও ভালো হওয়া দরকার।”
সমাপনী বক্তব্যে সাজেদা ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জাহিদা ফিজ্জা কবির বলেন, আলোচনায় এমন কিছু প্রশ্ন উঠে এসেছে যা ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনায় দিকনির্দেশনা দেবে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, “আমরা কীভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে জনকল্যাণে রূপান্তর করব? প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কি বৈষম্যও বাড়ছে?”
তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কাঠামো শক্তিশালী করতে এবং প্রতিষ্ঠাতার মূল্যবোধকে এগিয়ে নিতে এই সিম্পোজিয়ামের প্রাপ্ত শিক্ষা ও ধারণাগুলো কাজে লাগানো হবে।
অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের ‘ক্যাপাবিলিটি অ্যাপ্রোচ’ বা সক্ষমতা-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা অনুপ্রাণিত এই সিম্পোজিয়ামে স্বাস্থ্য ও জীবিকা, নগর-সহনশীলতা, জলবায়ু অভিযোজন, প্রাতিষ্ঠানিক গুণমান এবং সুশাসন—এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলার পাঠশালা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ জাভেদ চৌধুরী। সমাজবিজ্ঞানী, জনমিতি বিশেষজ্ঞ এবং সাজেদা ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ গবেষণা উপদেষ্টা ড. সাজেদা আমিন গবেষণার সাথে বাস্তব কার্যক্রমের সংযোগ স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “উন্নত মানের গবেষণা করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই গবেষণার ফলাফল যথাযথভাবে প্রচার ও উপস্থাপন করাও সমান—বা তার চেয়েও বেশি—গুরুত্বপূর্ণ।”
“উদ্দেশ্য-চালিত নেতৃত্ব: সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা” শীর্ষক প্যানেল আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম। প্যানেলিস্ট হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফারুক সোবহান; এম. সাইদুজ্জামান; ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান; এবং লিন্ডে বাংলাদেশ লিমিটেডের স্বতন্ত্র পরিচালক শাহজাদ মুনিম।
“আগামীর বিনির্মাণ: প্রতিষ্ঠান, উদ্ভাবন ও গুণমান” শীর্ষক অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক ফারাবী হাফিজ। এতে অংশ নেন পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের; রেনাটা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সৈয়দ এস. কায়সার কবির; ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী; মানবাধিকার কর্মী ড. হামিদা হোসেন; এবং আইসিডিডিআর,বি-র এমেরিটাস বিজ্ঞানী ও আইদেশির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও প্রধান ড. ফেরদৌসী কাদরী।
“স্বাস্থ্য, জীবিকা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি” বিষয়ক অধিবেশনে সাজেদা ফাউন্ডেশনের জ্যোতির্ময় সাহা ও শামীরা মোস্তফা তাঁদের গবেষণালব্ধ ফলাফল উপস্থাপন করেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল এই আলোচনার সভাপতিত্ব করেন; এতে আরও অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ. আই. মাহবুব উদ্দিন আহমেদ এবং বিআইজিডি'র নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন।
“স্বকীয়তা, সুস্থতা ও নগর-সহনশীলতা” শীর্ষক অধিবেশনে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী নামিরা শামিম। ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অফ পাবলিক হেলথ-এর অধ্যাপক সাবিনা ফয়েজ রশীদ অধিবেশনটির সভাপতিত্ব করেন এবং প্যানেলিস্ট হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাজেদা ফাউন্ডেশনের ব্যারিস্টার সাজেদা ফারিসা কবির ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কবিতা বোস।
“জলবায়ু অভিযোজন, জ্ঞান ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা” বিষয়ক অধিবেশনটি শুরু হয় সাজেদা ফাউন্ডেশনের প্রধান গবেষক মো. নুরুল ইসলামের উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এমেরিটাস ড. আইনুন নিশাত এই আলোচনার সভাপতিত্ব করেন। এতে আরও অংশ নেন সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাহীন ইসলাম।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং ‘বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট’-এর সম্মানীয় নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন ‘তথ্য-প্রমাণ থেকে কর্মসূচি ও নীতি’ শীর্ষক সমাপনী অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন। এতে বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অস্ট্রেলিয়া সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের ড. শামারুহ মির্জা।

