বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্যে নজর দিন

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০০

প্রতি বছর ১০ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব | মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এ বছর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য স্লোগান ছিল : 'Lived Experiences Heard Real Voices, Real Change' বাংলা ভাবার্থ : 'বাস্তব অভিজ্ঞতা শোনা : প্রকৃত কণ্ঠস্বর, প্রকৃত পরিবর্তন'। মানুষের সুস্থতা কেবল তার শারীরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক সচ্ছলতা কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠার ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত তার মানসিক প্রশান্তি, আবেগীয় ভারসাম্য, আত্মমর্যাদা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার সামর্থ্য। একজন মানুষ শারীরিকভাবে সুস্থ থেকেও মানসিক যন্ত্রণায় বিপর্যস্ত হতে পারেন। আবার মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যার মধ্য দিয়েও যথাযথ চিকিৎসা, পারিবারিক সহযোগিতা, সামাজিক স্বীকৃতি ও সহমর্মিতার মাধ্যমে স্বাভাবিক, সৃজনশীল এবং অর্থবহ জীবন যাপন করতে পারেন। অতএব, মানসিক স্বাস্থ্যকে মানবস্বাস্থ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা আধুনিক সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

মানসিক স্বাস্থ্য আজ বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব, জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক সংকট এবং ডিজিটাল জীবনের নানা চাপ মানুষের মানসিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের আঞ্চলিক বার্তা অনুযায়ী, বিশ্ব জুড়ে ১ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যার সঙ্গে বসবাস করছেন। উদ্বেগজনিত সমস্যা ও বিষণ্ণতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে : মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যা নিয়ে যারা জীবন যাপন করছেন, তাদের প্রয়োজন, অভিজ্ঞতা ও অধিকার কি আমাদের স্বাস্থ্যনীতি এবং সামাজিক ব্যবস্থায় যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে মানসিক স্বাস্থ্যকে কেবল চিকিৎসকের কক্ষ কিংবা হাসপাতালের সীমার মধ্যে আবদ্ধ রাখলে চলবে না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্থানীয় প্রশাসন এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়—সবখানেই মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত দুর্বলতার পরিচয় নয়। এটি মানবস্বাস্থ্যের একটি অপরিহার্য অংশ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে কোনো ব্যক্তিকে অপমান করা, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার করা কিংবা তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার অযৌক্তিকভাবে সীমিত করা মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থি। চিকিৎসা ও পরিচর্যার ক্ষেত্রে ব্যক্তির সম্মতি, গোপনীয়তা, স্বাধীনতা এবং মর্যাদাকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের প্রচারাভিযানে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যার পরিবর্তে অধিকারভিত্তিক, ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং সমাজভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করার পরিবর্তে অনেক মানুষ পরিবার ও সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে উপযুক্ত চিকিৎসা এবং সহায়তা পেতে আগ্রহী। তবে সমাজভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণের অ কেবল হাসপাতাল থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া নয়। এর জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসাকেন্দ্র, প্রশিক্ষিত কর্মী, আবাসন ও সামাজিক সহায়তা, পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান এবং জরুরি সেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশগুলোর মাত্র ৯ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণভাবে সমাজভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে পেরেছে। প্রায় ৫৩ শতাংশ এখনো এই রূপান্তরের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়লেও চিকিৎসাসেবা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। জনসংখ্যার তুলনায় মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত জনবলের সীমাবদ্ধতা, শহর ও গ্রামের মধ্যে সেবার বৈষম্য, চিকিৎসার ব্যয় এবং সামাজিক কুসংস্কার—এসব কারণে অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে সমস্যার সম্মুখীন হন। অনেক পরিবারে মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যাকে অসুস্থতা হিসেবে বিবেচনা না করে ব্যক্তিগত দুর্বলতা, ইচ্ছাশক্তির অভাব কিংবা পারিবারিক ব্যর্থতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের জন্য শুধু চিকিৎসাকেন্দ্র বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; মানুষের কথা শোনার সামাজিক সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরো সহজলভ্য করতে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যকে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, চিকিৎসক, নার্স, শিক্ষক এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। চতুর্থত, প্রয়োজন অনুযায়ী টেলিমেডিসিন ও ডিজিটাল পরামর্শসেবা সম্প্রসারণ করতে হবে। পঞ্চমত, মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সামাজিক কলঙ্ক দূর করতে শিক্ষা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়াতে হবে।

বর্তমান পৃথিবীতে তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রতিযোগিতা, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, পারিবারিক প্রত্যাশা, সামাজিক সম্পর্কের জটিলতা এবং ডিজিটাল যোগাযোগের চাপ তরুণদের মানসিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের সাফল্য, জীবনযাপন কিংবা অর্জনের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করার প্রবণতা কখনো কখনো হতাশা ও আত্মবিশ্বাসের সংকট তৈরি করতে পারে। অনলাইন হয়রানি, অপমানজনক মন্তব্য এবং ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারও মানসিক চাপের কারণ হতে পারে। তবে ডিজিটাল প্রযুক্তি শুধু ঝুঁকির উৎস নয়। যথাযথভাবে ব্যবহার করা হলে এটি মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে তথ্য পাওয়া, পেশাগত পরামর্শ গ্রহণ, সহায়তামূলক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং দূরবর্তী অঞ্চলে সেবা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শসেবা, নিরাপদ আলোচনার পরিবেশ এবং সহপাঠীদের পারস্পরিক সহযোগিতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে মূল্যায়ন না করে তাদের আবেগীয় ও সামাজিক সুস্থতার প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক জীবনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। একইভাবে মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে কেউ কর্মক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হলে তার প্রতি সহমর্মিতা দেখানো জরুরি। কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনায় উৎসাহিত করতে হবে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ কেবল উৎপাদন বৃদ্ধি কিংবা জাতীয় আয় বাড়ানো নয়; মানুষের জীবনযাত্রার মান, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং সুস্থতাও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তাই কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বৃহত্তর অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

২০১৮ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডব্লিউএইচও- এর হিসাবে এই সংখ্যা ৩ কোটিরও বেশি মানুষ, যাদের মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রয়োজন। শিশু ও কিশোরদের মধ্যে আক্রান্তের হার ১২ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ চিকিৎসা না পাওয়ার ক্ষেত্রে। জরিপ বলছে, আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিশুদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কোনও সেবাই নেন না। গত জুলাই মাসে সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন, ৯২ শতাংশের বেশি রোগী চিকিৎসার বাইরে থাকেন।

বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য পর্যাপ্ত ও ধারাবাহিক অর্থায়ন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। শহরকেন্দ্রিক বিশেষায়িত সেবার পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সেবার সুযোগ বাড়াতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তৈরির পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তবে অর্থায়নের কার্যকারিতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও সেবাগ্রহীতাদের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা উচিত। শুধু কতটি হাসপাতাল নির্মিত হয়েছে কিংবা কত জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে—তা দিয়ে সেবার প্রকৃত মান নির্ধারণ করা যায় না। মানুষ সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না, তাদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা হচ্ছে কি না এবং চিকিৎসা তাদের বাস্তব প্রয়োজন পূরণ করছে কি না—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্যকে বাস্তব রূপ দিতে ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য দেখায়, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে অগ্রগতি হলেও অর্থায়ন, দক্ষ জনবল, সমাজভিত্তিক সেবা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অর্থবহ অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। তাই মানসিক স্বাস্থ্যকে জাতীয় উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য এবং মানবাধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পরিবারে সহমর্মিতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ, কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সহজলভ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে এই পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।

 লেখক : ফিকামলি তত্ত্বের জনক, বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন