ভিশন ২০২১ অনুযায়ী বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ ও ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত করিতে হইলে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার প্রয়োজন। ইহার মাধ্যমে প্রয়োজন মানবসম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও অন্যান্য সম্পদের দক্ষতা বাড়াইয়া দারিদ্র্য বিমোচন, ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি ও উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি করা। এই লক্ষ্যে পৌঁছাইতে হইলে কারিগরি শিক্ষার হার বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নাই। বাংলাদেশে ২০২১, ২০৩০ ও ২০৪০ সালের মধ্যে এই হার যথাক্রমে ২০, ৩০ ও ৪০ শতাংশে উন্নীত করিবার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হইয়াছে। এইজন্য দেশে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন ও তাহার আলোকে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনসহ নূতন নূতন কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হইতেছে। তাহার পরও বলা হইতেছে দেশে কারিগরি শিক্ষার হার কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ে নাই।
কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা নিয়া পত্রপত্রিকায় নূতন যে রিপোর্টটি প্রকাশিত হইয়াছে তাহাতে কিছুটা হতাশার সুর রহিয়াছে। বলা হইতেছে, কারিগরি শিক্ষায় বিরাজ করিতেছে শুভংকরের ফাঁকি। কারিগরি শিক্ষার্থীর বর্তমান হার ১৪ শতাংশ বলা হইলেও আন্তর্জাতিক কারিগরি শিক্ষার সংজ্ঞা অনুযায়ী বাস্তবে ইহা ৮.৪৪ শতাংশ। কেননা এই শিক্ষাব্যবস্থায় রহিয়াছে নানা সংকট। শ্রেণিকক্ষ, ল্যাবরেটরি ও শিক্ষকসংকট মারাত্মক। এক শিক্ষককে দিয়া চালানো হইতেছে দুই শিফট। ইহা লইয়া শিক্ষকের মধ্যে ক্ষোভ বিদ্যমান। ফলে মানসম্পন্ন কারিগরি শিক্ষা যেন সুদূরপরাহত। এই শিক্ষাব্যবস্থা হইতে মেয়েরা কেন বিমুখ হইতেছে তাহা অনুসন্ধান করা উচিত। শ্রমবাজারের সঙ্গে অনেক কোর্স-কারিকুলামের কোনো সংগতি নাই। অর্থাত্ সিলেবাস এখনো অযুগোপযোগী। কারিগরি শিক্ষা লাভ করিয়া উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীরা তেমন একটা সুযোগ পাইতেছে না, ফলে বাড়িতেছে না তাহাদের সামাজিক মর্যাদা। এই কারণে অভিভাবকরা তাহাদের সন্তানদের কারিগরি শিক্ষায় ভর্তি করিতে উত্সাহিত হইতেছেন না।
আমরা মনে করি, কারিগরি শিক্ষার উন্নতিকল্পে সর্বাগ্রে সরকারি/বেসরকারি টিভিইটি ইনস্টিটিউটসমূহের অবকাঠামো ও জনবল বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। সাধারণ স্কুল-মাদ্রাসার লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী যাহাতে যুগোপযোগী কারিগরি শিক্ষা লাভ করিতে পারে, এইজন্য টিভিইটি ইনস্টিটিউটে সান্ধ্য কোর্স চালু করা বাঞ্ছনীয়। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান হইতে এইসব প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীনভাবে দক্ষ জনবল নিয়োগ দিয়া প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ইহা ছাড়া প্রতিটি উপজেলায় একটি করিয়া স্কুল বা কলেজকে কারিগরি কলেজে রূপান্তরিত করিয়া কারিগরি শিক্ষার এনরোলমেন্ট বৃদ্ধি করা যাইতে পারে। সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি ওয়ার্কশপ নির্মাণ করিয়া প্রতিটি শিক্ষার্থীকে অন্তত একটি বিষয়ে স্কিল ট্রেনিং গ্রহণের মাধ্যমে অধিক হারে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়িয়া টিভিইটি গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। তাহা ছাড়া কারিগরি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা প্রয়োজন। আমরা জনশক্তি রপ্তানিতে এখনো যেমন অদক্ষ ক্যাটাগরিতে রহিয়াছি, তেমনি দেশে দক্ষ জনবলের অভাবে বিদেশ হইতে লোক আনয়ন করিতেছি। এইজন্য জার্মানি, জাপান, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের কারিগরি শিক্ষার মডেল আমাদের অনুসরণ করিতে হইবে। জার্মানিতে কারিগরি শিক্ষার হার ৭৩ শতাংশ। অতএব, আমাদের দেশে এই শিক্ষার হার অন্তত ৬০ শতাংশে উন্নীত করিবার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করিতে হইবে।

