শোকের মাস আগস্ট। বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যা এবং তার পরিবারের সবার হত্যার সুষ্ঠু বিচার নিয়ে যখন আমরা উদ্বিগ্ন, যখন আমরা জাতির পিতাকে হারানোর পর শোকে কাতর, যখন আমরা তার আত্মার শান্তির জন্য মসজিদ, মন্দির, গির্জায় প্রার্থনা করছি, ঠিক তখনই ‘হাওয়া ভবনের’ কালো হাত বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট এই গ্রেনেড হামলার পূর্ণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করল। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে আমাদের প্রধানমন্ত্রী যখন তার বক্তব্য শেষ করে অস্থায়ী মঞ্চ থেকে নামবেন, ঠিক সেই মুহূর্তে মাত্র দেড় মিনিটে ১১টি গ্রেনেড হামলা হয়। তখন আমাদের সিনিয়র নেতারা তাকে ঘেরাও করে মানবঢাল তৈরি করেন, যাতে আমাদের বঙ্গবন্ধুকন্যার গায়ে আঘাত না লাগে। কোনো রকমভাবে তাকে বুলেটপ্রুফ গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে ধানমন্ডির ৫ নম্বর সুধা সদনে নিয়ে যাওয়া হয়। চারদিকে তখন আহাজারি। কারো হাত নেই, কারো পা নেই। সিনিয়র নেতা থেকে শুরু করে সবাই তখন রক্তে জর্জরিত। আমি তখন ছিলাম ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডবিষয়ক এক আলোচনাসভায় শেরাটন হোটেলে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বরিতগতিতে চলে এলাম সুধা সদনে। এসে দেখি আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা ঘরের কোনায় চেয়ারে বসে আছেন। আমাকে দেখে বললেন :‘ওয়ালি ভাই, আপনি এসেছেন? ভালোই হলো। Now go and tell the whole world, this is the democracy of khaleda Zia.’

তার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথোপকথনের পর আমি বেরিয়ে পড়ি বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর উদ্দেশে। ওখানে গিয়ে দেখি কী দুর্বিষহ অবস্থা। যেন নরকের এক প্রান্ত খোলা হয়েছে। নেতাকর্মীদের যে কোনোভাবে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে হাসপাতালে। আর লাশগুলো রাখা হচ্ছে এক গাড়িতে। সে কী লোমহর্ষক দৃশ্য। আমি ওখান থেকে তাড়াতাড়ি করে চলে গেলাম হাসপাতালে। সাত-আটটা হাসপাতালে ভর্তি ছিল তিন শতাধিক মানুষ। ধানমন্ডির বাংলাদেশ মেডিকেল নামক এক বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে দেখি আরও ভয়াবহ দৃশ্য। আমি সেখানে গিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বললাম, তারা আমাকে বলল যে, এখনই কিছু ইনজেকশন কিনতে হবে। আমি ইনজেকশন কেনার ব্যবস্থা করলাম। আমি ডিউটি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে কিছু টাকা ও আমার সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা তৈরি করলাম। ভয়াল সেই স্প্লিন্টারের আঘাতে আমাদের নেতাকর্মীরা দিনের পর দিন ভুগেছেন। তাদের মধ্যে এক জনের কথা না বললেই নয়। তিনি হচ্ছেন মেয়র হানিফ। তার মাথায় গ্রেনেডের আঘাত লেগেছিল। তা নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন অসহনীয় যন্ত্রণা ভোগ করে ২০০৬ সালে ইন্তেকাল করেন। জনাব সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তার সঙ্গে দেখা হলেই আমাকে স্প্লিন্টারে তার পায়ের আঘাত ও তার ব্যথা সম্পর্কে বলতেন। আমরা বন্ধু থাকায় তিনি আমাকে প্রায়সই এ নিয়ে কথা বলতেন। দিনের পর দিন তিনি কীভাবে এই ব্যথা সহ্য করে গেছেন, তা আমি দেখেছি।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট থেকে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট কিন্তু বেশি ব্যবধান নয়। বিএনপি-জামায়াত দিনের পর দিন তাদের একটি মাত্রই পরিকল্পনা—এই স্বাধীনতার শক্তি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে চলা একমাত্র দল আওয়ামী লীগকে শেষ করে ফেলা, যার কারণে খালেদা জিয়া তার পুত্রকে এই জঘন্যতম হামলায় সাহায্য করেন। তার ছেলে তারেক রহমান, তার দলের তত্কালীন স্বরা‘ষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর মহাসচিব ও তত্কালীন সমাজকল্যাণমন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ—তাদের সবাইকে নিয়ে গুলশানের হাওয়া ভবনে এই পরিকল্পনা করেন। তারা পাকিস্তানিদের সাহায্য নিয়ে দিনের পর দিন এই দেশের ক্ষতি সাধন করে গেছে। তথ্যমতে দেখা যায়, তারা যে গ্রেনেড ব্যবহার করেছে, তা-ও পাকিস্তান থেকে এনেছে। তারা হুজি বাহিনীর সাহায্যও নিয়েছিল এই হামলায়। কতটা স্বাধীনতাবিরোধী হলে মানুষ এমন কাজ করতে পারে! যে স্বাধীনতার জন্য আমারা ৯ মাস যুদ্ধ করলাম, দেশ স্বাধীন করলাম, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ গড়ার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি, আর সেই স্বাধীনতার বিরোধীদের হাত ধরে তারা এমন নৃশংস কাজ করল! যে দেশ স্বাধীন, সে দেশে কীভাবে দুটো পক্ষ থাকে? কীভাবে স্বাধীনতার বিরোধিতা করে তারা এমন জঘন্য কাজ করতে পারে? ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর এর রায়ের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। এমন হত্যাকাণ্ডের বিচার পেতে আমাদের ১৪টি বছর লেগে গেল। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় গ্রেনেড হামলার বিচার যেন অনেকটা হাস্যরসভাবে চলছিল। তার লোক দেখানো আসামি ও তার নিজের তৈরি করা সিআইডি টিম—সবকিছুই যেন এক নাটকীয় রূপ। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় যেন কোনো স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি না আসতে পারে, তা নিয়ে আমরা পণ করেছি, প্রতিনিয়ত আমরা তা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্ন দেখেছেন, তা নিয়ে আমরা সব সময় কাজ করে যাব। আর কোনো স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি যেন দেশের মানুষের ক্ষতি সাধন না করতে পারে, তার জন্য আমরা সদা জাগ্রত।
লেখক: সাবেক সচিব,পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
ইত্তেফাক/কেকে

