নাগালে শীতকালীন শাকসবজি

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২১, ০৭:৪১

বাংলাদেশের ঋতু পরিক্রমায় শীতকালটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসময়ে অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে শীতকালীন শাকসবজি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। শীতকালে বাংলাদেশে অনেক বাহারি জাতের শাকসবজি উত্পাদিত হয়। বছরের অন্য সময়ে যে পরিমাণ শাকসবজি উত্পাদিত হয়, তার মধ্যে শীতকালে অনেক বেশি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর শাকসবজি উত্পাদন করা হয়।

সাধারণত শীতের শুরুর দিকে উত্পাদন কম হওয়ায় তখন এ শাকসবজির মূল্য অনেক বেশি থাকে। সে সময় এত দাম দিয়ে প্রয়োজনীয় পরিমাণ শাকসবজি সবাই কিনে খেতে পারে না। কারণ বাংলাদেশের সব মানুষের ক্রয়-সামর্থ্য সমান নয়। তাই তখন ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও এসব পুষ্টিসমৃদ্ধ, সুস্বাদু, মজাদার শাকসবজি ক্রয় করা সম্ভব হয় না। কিন্তু সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্পাদনও বাড়তে থাকে। আর অর্থনীতির ভাষায় আমরা সহজেই একটি বিষয় বুঝতে পারি যে, চাহিদা যত বেশি দাম তত বেশি, অন্য দিকে জোগান যত বেশি দাম তত কম। আবার বেশি উত্পাদিত হয়ে জোগান বেশি হলে দাম কম হয়। অর্থাত্ বর্তমানে আমরা শীতকালের মধ্যপ্রান্তে রয়েছি। সেজন্য শীতকালীন শাকসবজির উত্পাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এখন। তাই এখন বাজারে শাকসবজির অনেক সরবরাহ। কাজেই যেসব শাকসবজি এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর ক্রয়মূল্য সবার নাগালের মধ্যেই রয়েছে।

আমরা জানি, কোনো একটি ফসল উত্পাদিত হওয়ার পর তা পরবর্তী মৌসুমে আবার নতুনভাবে উত্পাদিত না হওয়া পর্যন্ত সেগুলো দিয়ে বাকি সময়ের চাহিদা মেটাতে হয়। এর মধ্যে বিদেশে রপ্তানি, সময়মতো আমদানি করতে না পারা, সঠিকভাবে ও পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করতে না পারা, এমনকি অনেক সময় অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণে মৌসুমের মধ্যখানে এসে ক্রাইসিস দেখা দিতে পারে। তখন আবার মূল্য বেড়ে যায়। গত বছর (২০২০) শেষ দিকে এসে পেঁয়াজ, গোলআলুর মূল্যবৃদ্ধি তেমনই একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। কিন্তু সরকার তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে এবং বাঙালি উদ্যোগী কৃষক ভাইদের মাথার ঘামে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে।

শাকসবজির বিষয়টি পুরো বিপরীত। কারণ, শাকসবজি তাজা ও কাঁচা প্রকৃতির হওয়ায় তা পচনশীল হয়ে থাকে; যা দীর্ঘদিনের জন্য সংরক্ষণ করে গুদামজাত করা যায় না। আর সেজন্যই উত্পাদন মৌসুমে এসব শাকসবজির মূল্য খুবই ওঠানামা করতে দেখা যায়। আগেই বলা হয়েছে, মৌসুমের শুরুর দিকে মূল্য বেশি এবং শেষের দিকে মূল্য কম থাকে। আর সেজন্য শীতকালীন শাকসবজি নিয়ে অনেক সময় বিপর্যয়ে পড়তে দেখা যায় উত্পাদক কৃষককে। অনেক সময় পানির দরে বিক্রি করতে হয় সেসব শাকসবজি। গত দুই বছর আগেও আলু, টম্যাটো ইত্যাদি বিক্রি করতে না পেরে রাস্তায় ফেলে দিতে দেখেছি। কিন্তু এ বছর এখনো দাম এমন পর্যায়ে রয়েছে যেখানে উত্পাদক ও ভোক্তা কেউই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না।

তবে বাজারমূল্য স্থিতিশীল ও সবার জন্য সমানভাবে রাখতে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হয়। কারণ, উত্পাদকদের কাজ উত্পাদন করা আর সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সময়মতো বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা নিতে হবে। এখন স্বাভাবিক বাজারজাতকরণের সঙ্গে অনলাইন পদ্ধতিতে ডিজিটাল বাজারকরণ সময়ের দাবি। যেসব এলাকায় যে জাতের শাকসবজি উত্পাদিত হয়, সেখানে সব শাকসবজির চাহিদা মিটিয়ে—যেসব স্থানে উত্পাদিত হয় না, সেসব স্থানে এগুলো বাজারজাতকরণে ডিজিটাল ব্যবস্থা খুবই কার্যকর। আর এবারের করোনা পরিস্থিতিতে তা খুব ভালোভাবে কাজ করেছে। এর মাধ্যমে কৃষক তার উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পেয়েছেন এবং ভোক্তারাও সঠিক সময়ে সঠিক মূল্যে পণ্যের সরবরাহ পেয়েছেন।

এখন করোনাকাল চলছে। করোনাকালে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের মাধ্যমে শারীরিক রোগ প্রতিরোধের মাধ্যমে খাদ্য-নিরাপত্তা বিধান করা সম্ভব বলে স্বাস্থ্যবিধির অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উল্লিখিত শীতকালীন শাকসবজি খেলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। শীতকালে মানুষের শরীরে পুষ্টির বিশেষ কিছু চাহিদা সৃষ্টি হয়। সেখানে বাংলাদেশে উত্পাদিত শাকসবজি খুবই ভালো। যেসব শাকসবজি মোটেও সংরক্ষণ করে রেখে খাওয়া যায় না, সেসব তাত্ক্ষণিক সংগ্রহ করে খেতে হবে। ফুলকপি, বাঁধাকপি, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ইত্যাদি রেখে খাওয়া যায় না। কিন্তু গোলআলু, টম্যাটো ইত্যাদি সারা বছরই খাওয়া যায়। তবে এখন বাজারে শীতকালীন শাকসবজি অনেক সরবরাহ ও সমারোহ। সেজন্য দাম কম বলে প্রয়োজন মতো সবাই কিনে খেতে পারছেন। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় গড়ে কমপক্ষে ২৫০ গ্রাম শাকসবজি থাকার বিষয়টি এখন নিশ্চিত করা সম্ভব। কাজেই সবাইকেই এসময়ে বেশি পরিমাণে শীতকালীন শাকসবজি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া প্রয়োজন। এটি সম্ভব, তার কারণ শীতকালীন সব শাকসবজিই এখন দামে এবং উত্পাদনে সবার নাগালের মধ্যে।

ইত্তেফাক/এএইচপি