পুলিশ ফাঁড়িতে ‘নির্যাতনে’ রায়হান হত্যা: এসআই হাসান সাময়িক বরখাস্ত 

পুলিশ ফাঁড়িতে ‘নির্যাতনে’ রায়হান হত্যা: এসআই হাসান সাময়িক বরখাস্ত 
হাসান উদ্দিন।ছবি: ইত্তেফাক

সিলেটের বন্দর বাজার ফাঁড়িতে ‘নির্যাতনে রায়হান আহমদ হত্যা’র ঘটনায় ফাঁড়ির টু-আইসি উপ-পরিদর্শক (এসআই) হাসান উদ্দিনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া এ তথ্য জানায়।

বলা হয়, ঘটনার মূল অভিযুক্ত বন্দর বাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে ফাঁড়ি হতে পালাতে সহায়তা করা ও তথ্য গোপনের অপরাধে হাসানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। ফাঁড়িতে নির্যাতনে রায়হান মারা যাওয়ার ঘটনায় বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবরসহ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। এদের মধ্যে কেবল টিটুকে গ্রেফতার দেখানো হয়। তবে, বরখাস্ত হওয়ার পর থেকে আকবর পলাতক। বাকিরা এসএমপি পুলিশ লাইন্সে পুলিশের নজরদারিতে আছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সূত্র।

এদিকে পুলিশ ফাঁড়িতে ‘নির্যাতনে’ যুবক রায়হান হত্যা মামালার মূল অভিযুক্ত বরখাস্তকৃত এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে ১০ দিন পরও গ্রেফতার করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এ জন্য জনমনে অসন্তোষ বিরাজ করছে। পাশাপাশি নানা প্রশ্ন ও গুজবের ডালপালা মেলছে। বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির মাসিক বিরাট অংকের আয় রোজগারের বিষয়টিও আলোচনায় আসছে। যা আকবরই নিয়ন্ত্রণ করতেন।

অনেকেই প্রশ্ন করেছেন-আকবর কিভাবে কাদের সহায়তায় পালাতে সক্ষম হলেন। আকবরের কাছে কি এমন জাদু-যে কড়া নির্দেশনার পরও সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছেন। এতোদিনেও আকরের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তথ্য প্রযুক্তিসহ পুলিশের সব বুদ্ধি ও মেধা অন্তঃসার শূন্য প্রমাণ করে আকবর পালিয়ে যাওয়া ও ধরা না পড়ার বিষয়টি। আকবরের পালিয়ে যাওয়ার সাথে মহানগর পুলিশসহ অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা এ বিষয়ে পুলিশ সদরদপ্তরের একটি তদন্ত দল পাঠিয়েছে সিলেটে।

অবশ্য সিলেট পিবিআই পুলিশ সুপার খালেকুজ্জামান বলেছেন, আকরকে ধরতে পিবিআই’র একাধিক টিম কাজ করেছে। কয়েকটি স্থানে অভিযানও চালানো হয়। তিনি বলেন, নানা বিষয় মাথায় রেখে কাজ করতে হয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সিলেটে সাংবাদিকদের বলেছেন, অভিযুক্ত এসআই আকবর দেশেই রয়েছে। পালিয়ে বিদেশে গেলেও তাকে ধরে আনা হবে।

২০১৯ সালের ৬ নভেম্বর বন্দরবাজার ফাঁড়িতে ইনচার্জ হিসেবে যোগ দেন এসআই আকবর। রায়হান হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গত ১২ অক্টোবর সাময়িকভাবে বরখাস্ত হন তিনি। কিন্তু কোথায় আছেন আকবরকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। তাকে না পাওয়া বা গ্রেফতার না করায় শত প্রশ্ন রায়হানের পরিবারের ও সিলেটের সচেতন মহলের। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার সিলেটসহ সারা দেশে ঝড় উঠে এসআই আকবর গ্রেফতার হয়েছে বলে। পরে জানা যায় বিষয়টি গুজব।

রায়হান হত্যা ঘটনার প্রধান হোতা পলাতক এস আই আকবরকে যখন ধরতে পারছে না পুলিশ। ঠিক এই সময় গত সোমবার আকবরকে ধরিয়ে দিতে পারলে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা দেন যুক্তরাষ্ট্রের সিলেটি ব্যবসায়ী সামাদ খাঁন।

সামাদ খাঁন বলেন, আকবরকে ৭২ ঘণ্টার ভেতরে যে ধরিয়ে দিতে পারবে তাকে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার দেয়া হবে। তার এই ঘোষণারও সময়সীমা প্রায় শেষ। তবুও আকবরের টিকিটি কেউ পাচ্ছে না।

৭২ ঘণ্টা আল্টিমেটাম অতিবাহিত, পরবর্তী কর্মসূচি

পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে রায়হান আহমদকে হত্যার সাথে জড়িতদের গ্রেপ্তারে ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলো তার পরিবার গত রবিবার। নিজ বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন করে তারা এসআই আকবরসহ অভিযুক্ত সকলকে গ্রেপ্তারে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন রায়হানের মা সালমা বেগম। বেঁধে দেওয়া সময়সীমা অতিক্রম হয়েছে বুধবার দুপুরে। কিন্তু এখনও প্রধান অভিযুক্ত আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। একমাত্র পুলিশ কনস্টেবল টুটু চন্দ্র দাস ছাড়া এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত আর কোনো গ্রেপ্তার নেই। ফলে লাগাতার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে রায়হানের পরিবার। এমনটিই জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

তারা জানান, বৃহস্পতিবার পরিবার ও এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে সাক্ষাৎ, পরদিন শুক্রবার বাদ জুমা মসজিদে মসজিদে রায়হানের জন্য দোয়া মাহফিল ও শনিবার বিকেল ৪ টায় এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে মদিনা মার্কেট পয়েন্টে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হবে। পরিবারের পক্ষে বিষয়টি নিশ্চিত করেন রায়হানের স্বজন মো. শওকত হোসেন। তিনি ঘোষিত প্রতিটা কর্মসূচি সফল করতে সিলেটের সর্বস্তরের জনসাধারণের সহযোগিতা কামনা করেন।

তিনি বলেন,৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটামের অভিযুক্তরা গেপ্তার না হলে হরতালসহ কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মানুষের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে আমরা আপাতত কঠোর কর্মসূচি থেকে সরে এসেছি। তবে এরপর যদি প্রশাসন জড়িতদের গ্রেপ্তারে ব্যর্থ হয় তাহলে নতুন করে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা আসবে। দুপুরে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের ধরতে ও বিচারের দাবিতে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির সামনের রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ সিলেটের কর্মীরা।

গত ১১ অক্টোবর ভোরে পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতন করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় রায়হানের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন রায়হানের স্ত্রী। মামলাটি পরে পুলিশ সদর দফতরের নির্দেশ পিবিআইতে স্থানান্তর হয়।

তদন্তভার পাওয়ার পর পিবিআইর টিম ঘটনাস্থল বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ি, নগরীর কাস্টঘর এলাকা পরিদর্শন করে। রায়হানকে ফাঁড়িতে এনে নির্যাতনের প্রাথমিক প্রমাণ পায় তদন্ত কমিটি। পরে বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া, কনস্টেবল হারুনুর রশিদ, তৌহিদ মিয়া ও টিটুচন্দ্র দাসকে সাময়িক বরখাস্ত এবং এএসআই আশেক এলাহী, এএসআই কুতুব আলী ও কনস্টেবল সজিব হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়।

পরে পিবিআই লাশ দ্বিতীয়বারের মত কবর থেকে তুলে পুনরায় ময়নাতদন্ত করায়। রায়হানের মরদেহে ১১৩ আঘাতের চিহ্ন উঠে এসেছে ফরেনসিক রিপোর্টে। এসব আঘাতের ৯৭টি ফোলা আঘাত ও ১৪টি ছিল গুরুতর জখমের চিহ্ন। এসব আঘাতগুলো লাঠি দ্বারাই করা হয়েছে। অসংখ্য আঘাতের কারণে হাইপোভলিউমিক শক ও নিউরোজেনিক শকে মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনিসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো কর্মক্ষমতা হারানোর কারণে রায়হানের মৃত্যু হয়।

অন্যদিকে সোমবার সিলেটের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর আদালতের বিচারক মো. জিহাদুর রহমানের খাস কামরায় বন্দরবাজার ফাঁড়িতে কর্মরত পুলিশ কনস্টেবল দেলোয়ার, সাইদুর ও শামীম সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। রায়হানকে নির্যাতনের ঘটনার তারা প্রত্যক্ষদর্শী । অপরদিকে মঙ্গলবার বরখাস্তকৃত পুলিশ কনস্টেবল টিটুকে ৫দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ।

রায়হানের বাড়িতে তদন্ত দল

রায়হান নিহতের ঘটনায় পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্ত কমিটি পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (এআইজি) মোহাম্মদ আয়ুবের নেতৃত্বে মঙ্গলবার রাতে রায়হানের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলেন। পরে এআইজি মোহাম্মদ আয়ুব বলেন, এসআই আকবরের পালিয়ে যাওয়ার সাথে আর কোনো পুলিশ সদস্য জড়িত কী না এ ব্যাপারে তদন্ত করতে তারা সেখানে যান এবং রায়হানের পরিবারের কাছে কোনো তথ্য আছে কী না তা জানতে চান। তদন্ত দল দুএকদিনের মধ্যেই তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবেন বলে জানান তিনি।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত