দেশের বেসরকারি বিদ্যুেকন্দ্রের মালিক-উদ্যোক্তারা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (সঞ্চিতি) থেকে ঋণ চান। নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং তাদের বিদ্যমান ঋণ পরিশোধের জন্য রিজার্ভের অর্থ চান তারা। গত সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে এমন অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে বেসরকারি বিদ্যুেকন্দ্রগুলোর উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা)।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, রিজার্ভের অর্থ দেশের বাইরে বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয়। বিদেশি সংস্থার চেয়ে বেশি সুদে তারা এ ঋণ পরিশোধ করবেন। অন্যদিকে উদ্যোক্তারা বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে যে সুদহারে ঋণ নেন তার চেয়ে কম সুদে তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবেন। তাদের দাবি, এটি দুই পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, রিজার্ভ একটি দেশের ভাবমর্যাদা বৃদ্ধি করে। সার্কভুক্ত দেশগুলোতে ভারতের পরই বাংলাদেশের রিজার্ভ সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধ। সংকট ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় রিজার্ভ রাখা হয়। সরকার চাইলে সরকারের কোনো কাজে এখান থেকে যৌক্তিক পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে পারে। তবে এখনই কাউকে ঋণ দেওয়ার চিন্তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নেই।
দেশে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৩ বিলিয়ন (৪ হাজার ৩০০) মার্কিন ডলার। গত কয়েক বছর ধরেই রিজার্ভের অর্থ দেশীয় প্রকল্পে বিনিয়োগ করা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে। গত বছরের জুলাইয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে সরকারি খাতের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ দেওয়া যায় কি না, তা বিচার-বিবেচনা করতে নির্দেশনা দেন।
প্রধানমন্ত্রী সরকারি প্রকল্পের কথা বললেও এরপর থেকে কয়েক জন বেসরকারি উদ্যোক্তা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তদবির করেন। ঐ জুলাই মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ৯০৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (৭ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা) ঋণ চেয়ে আবেদন করে বেসরকারি শিল্প গ্রুপ ওরিয়ন। রিজার্ভ থেকে টাকা নিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায় তারা। এখন পর্যন্ত কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট একটি ব্যাংক একসঙ্গে এত টাকা ঋণ দেয়নি। ওরিয়নের ঐ আবেদন এখনো অনুমোদন বা নাকচ- কোনোটিই করেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত ডিসেম্বরে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির এক সভাশেষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানান, আগামী বাজেটের আগেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য ঋণ নেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে।
অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইমরান করিম ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের বর্তমান রিজার্ভ প্রায় ৪৩ বিলিয়ন ডলার। রিজার্ভের অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশে বন্ড বা সার্বভৌম গ্যারান্টিসহ অন্য উপায়ে যে বিনিয়োগ করে তাতে এক শতাংশের বেশি আয় হয় না। এটি খুবই কম। অথচ বিদ্যুেকন্দ্র তৈরি করার জন্য বেসরকারি উদ্যোক্তারা সার্বভৌম গ্যারান্টিসহ যে বৈদেশিক ঋণ নেয় তাতে সুদ বাবদ খরচ ৬ শতাংশ পড়ে যায়। এ ঋণ বৈদিশিক মুদ্রাতেই পরিশোধ করতে হয়। তাই বিদেশে বিনিয়োগের পরিবর্তে দেশেই আরো বেশি সুদহার নিয়ে বেসরকারি বিদ্যুত্ খাতে বিনিয়োগ করতে পারে। সেটি ৩-৪ শতাংশও হতে পারে। এমন আলোচনা চলছে। সেক্ষেত্রে আমাদের ব্যয় কমবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের আয় বাড়বে।
বিপ্পার চিঠিতে বলা হয়, রিজার্ভ থেকে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অবকাঠামো প্রকল্পে ঋণ প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। এমন ঋণ পেতে বিদ্যুত্ খাত অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। কেননা এই খাতের সব আইপিপি প্রকল্প সার্বভৌম গ্যারান্টি পায়। এ খাতের আয় বৈদেশিক মুদ্রায় অর্জিত হয়। আবার বিদেশ থেকে ঋণও নেয়। বর্তমানে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ রয়েছে। রিজার্ভ থেকে ঋণ পাওয়া গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ঋণ খেলাপের কারণে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অবস্থা নাজুক। আমাদের উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ ঋণ নিয়ে তা শোধ করতে চান না। ঋণ নেওয়ার আগে অনেক ভালো কথা বলে, আশ্বাস দেয়। কিন্তু ব্যাংককে পরে তাদের পেছনে ঘুরতে হয়। সুশাসনেরও অভাব রয়েছে। এমন অবস্থায় সরকারের মেগা প্রকল্পে ঋণ দেওয়া গেলেও বেসরকারি খাতে দেওয়া উচিত হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এছাড়া দেশে অনেক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সেগুলোর পেমেন্ট এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য বড় রিজার্ভ থাকার দরকার রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরাও রিজার্ভ থেকে ঋণ দিতে অনুত্সাহিত করছেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, সরকারি-বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে দুর্বল করে ফেলেছে কতগুলো বেসরকারি কোম্পানি-গ্রুপ। ঋণ সময়মতো শোধ করছে না। এ খাতে সুশাসনের অভাব রয়েছে। রিজার্ভ থেকে বেসরকারি খাতে এখন ঋণ দেওয়া উচিত হবে না। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঝুঁকি আরো বাড়বে। বরং যে টাকা খেলাপি পড়ে রয়েছে তা আদায়ে দ্রুততর পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত।
এ বিষয়ে বিপ্পার সভাপতি ইমরান করিম বলেন, বেসরকারি বিদ্যুেকন্দ্রের পণ্য কেনে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। ঋণ আদায় নিয়ে সংশয় থাকলে পিডিবির প্রদেয় পেমেন্ট থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণের সুদ-আসল টাকা নির্দিষ্ট হারে কেটে রাখতে পারে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিষয়টি সেভাবেও বাস্তবায়ন করা যায়।

