শতবর্ষী আকবরিয়ার আলো...

আপডেট : ১১ জুন ২০২১, ২১:৫২

ছিলেন মেকানিক, সেখান থেকে মিষ্টির ফেরিওয়ালা। এই মিষ্টি বিক্রির পুঁজি থেকেই ভাতের হোটেল দেন আকবর আলী মিঞা। সেখান থেকেই জন্ম আজকের আকবরিয়ার। এরপর ১১০ বছরের পথচলায় দেশের জন্য গর্বের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। খাবারের মান, সেবা ও নতুন নতুন খাবার চালু করে যেমন দেশ জুড়ে ট্রেন্ড সৃষ্টি করেছে প্রতিষ্ঠানটি—একইভাবে নিরন্ন, অসহায় মানুষকে খাবার দিয়ে, স্বাবলম্বী করেও সৃষ্টি করেছে উদাহরণ। ভালো মানের খাবার পরিবেশনের পাশাপাশি জনসেবামূলক কাজ করে দেশের একটি অনুকরণীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে বগুড়া জেলার আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট।

উত্তরের বগুড়া জেলা নানা কারণেই বিখ্যাত। কিন্তু ব্যক্তিপ্রতিষ্ঠানও তার কাজ ও সেবা দিয়ে একটি স্থানের, জেলার এমনকি দেশ জুড়ে সুনাম ছড়ায় কখনো কখনো। বগুড়ার আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট শত বছরের বেশি সময় ধরে মানুষের সেবা দিয়ে নিজেদের সেই উচ্চতায় তুলে এনেছে। চল্লিশ থেকে ষাটের দশকে ঘি দিয়ে রান্না করা বিরিয়ানির দাম ছিল এক টাকা প্লেট। সেই সময়ে আকবর মিঞা তার হোটেলে ১৫ থেকে ২০ টাকার মধ্যে সারা মাস তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা করতেন। ব্রিটিশ আমলে শহরে বিদ্যুত্ না থাকলেও তিনি নিজস্ব জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছিলেন। সুলভ মূল্যে ভালো খাবার এবং এমনি নিত্যনতুন চমকে আকবরিয়ার নামডাক দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বগুড়ার সাদা চিকন সেমাইয়ের দেশব্যাপী যে কদর তার মূলেও ছিলেন আকবর আলী। সে সময় কলকাতা থেকে সেমাই আসত বাংলাদেশে। সেমাই তৈরির গল্প কারো জানা ছিল না। এই অঞ্চলের মুসলমান বা সাধারণ মানুষদের অল্প দামে সেমাই খাওয়ানোর তাগিদ থেকে তিনি সেমাই তৈরি করে সফল হন। হোটেল ব্যবসায় দিন দিন ব্যাপক প্রসার ঘটতে থাকে। ধর্মভীরু মানুষ আকবর আলী ব্যবসায় উন্নতি এবং প্রসারে সৃষ্টিকর্তার রহমত আছে—এ কথা বিশ্বাস করতেন। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি আয়ের একটা অংশ দিয়ে প্রতিদিন রাতে গরিব, মুসাফির, ভিক্ষুক, মিসকিনদের খাওয়াতেন। তাদের খাওয়াতে গিয়ে তত্কালীন আয়কর বিভাগ তাকে আয়কর দিতে চাপ দিতে থাকে। একসময় নিজের একটা পুকুর ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি করে আয়কর পরিশোধ করেন। তার পরও তিনি ফকির-মিসকিনদের খাওয়ানো বন্ধ করেননি। তিনি সেটা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত করে গেছেন। পরবর্তীকালে তার বংশধররা সেই ধারা চালু রেখেছেন। সেই সঙ্গে মানুষের সেবার পরিধির আরো বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন।

আকবর আলী মিঞার ছোট ছেলে ও আকবরিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. হাসান আলী আলাল জানান, ১৯১১ সালে হোটেলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই হোটেলের আয় দিয়ে বাবাই প্রথম দিনহীন মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত বাবার সেই নিয়ম পালন করে যাওয়া হচ্ছে। মূলত খাবারটি বিতরণ শুরু হয়েছিল মুসাফিরদের জন্য। কালক্রমে মুসাফিরের জায়গায় এখন দিনহীন মানুষকে খাবার দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, যে কেউ খাবার নিতে পারে।

বগুড়ার আকবরিয়া

আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেলের প্রতিষ্ঠাতা আকবর আলী মিঞার জন্ম ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলায়। ভাগ্য অন্বেষণে সপরিবারে প্রথমে বাংলাদেশের পাকশী, পরে সান্তাহার এবং সবশেষে বগুড়ায় এসে থিতু হন। স্বাধীনচেতা আকবর আলী মিঞা ভাইয়ের সঙ্গে মেকানিকের কাজ শুরু করেন। ঐ সময় বগুড়া শহরে মুসলমানদের খাবারের কোনো হোটেল ছিল না। হিন্দু সম্প্রদায়ের হোটেলে আবার মুসলমানরা যেত না। আবার হিন্দু হোটেলে মুসলমানদের প্রবেশ ছিল না। এই সময় তিনি হোটেল করার চিন্তাভাবনা শুরু করেন। কিন্তু হোটেল করার প্রয়োজনীয় অর্থ ছিল না। হোটেলের পুঁজির জন্য নিজে মিষ্টি তৈরি করে ফেরি করে বিক্রি শুরু করেন। মিষ্টি বিক্রির কিছু পুঁজি নিয়ে ১৯১১ সালে বগুড়া শহরের চকযাদু সড়কের মুখে মাসিক ৮ টাকা ভাড়া দিয়ে একটি হোটেল শুরু করেন। সেখান থেকেই শুরু আজকের আকবরিয়ার। বগুড়া শহরে তত্কালীন সময়ে আকবর আলীর ছোট্ট হোটেলই ছিল মুসলমানদের একমাত্র খাবার হোটেল। খুব দ্রুত হোটেলের নামডাক ছড়িয়ে যায়। বগুড়ায় সে সময় মুসলমানদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সেখানে ক্রেতাদের স্থান সংকুলান হতো না। ক্রেতাদের কথা ভেবে তিনি শহরের (বর্তমান) কবি নজরুল ইসলাম (থানা রোড) সড়কে হোটেলটি স্থানান্তর করেন, যা বর্তমানে আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেল হিসেবে পরিচিতি পায়।

আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেলের এখন শহরেই চারটি শাখা। কবি নজরুল ইসলাম সড়কে আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেল, ইয়াকুবিয়ার মোড়ে মিষ্টি মেলা, কোর্ট চত্বরে এবং শহিদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট। সংযোজন করা হয়েছে, আবাসিক, বেকারি, চাইনিজ, থাই ও ফাস্ট ফুড, লাচ্ছা-সেমাই, দই, বিস্কুট। কর্মচারী রয়েছে সহস্রাধিক। আকবর আলীর সেই লাচ্ছা-সেমাই এখন বিদেশের বাজারেও বিক্রি হয়ে থাকে। আকবরিয়ার বেকারি পণ্য বগুড়া জেলা ছাড়াও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও থানায় অন্তত ২০টি শাখা খুলেছে।

প্রতিদিন রাতে নিরন্ন মানুষকে খাবার দেয় আকবরিয়া

হোটেল প্রতিষ্ঠার একবারে শুরু থেকেই প্রতিদিন রাতে তিনি মুসাফির, গরিব ও ভিক্ষুকদের খাওয়াতেন। শত বছর ধরে সে প্রথা আজও চালু রয়েছে। ১৯৭৫ সালে মৃত্যুর আগে আকবর মিঞা পুত্রদের হোটেলের আয় থেকে মুসাফির, ভিক্ষুক, গরিবদের খাওয়ানোর  নির্দেশ দিয়ে যান। সে কথার এতটুকু নড়চড় হয়নি আজও। পিতার শুরু করা নিয়ম মেনে তার ছেলে বা নাতিরা আজও তা পালন করে যাচ্ছেন। শতবছর ধরেই একবেলা বিনা মূল্যে এই খাবার তুলে দিয়ে যাচ্ছে আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট।

রাত ১১টার পরে বগুড়া শহরের কবি নজরুল ইসলাম সড়কের নিউ মাকের্টের সামনে গেলেই দেখা যাবে অসংখ্য নারী, পুরুষ ও শিশু প্রধান সড়কের দুই ধারে বসে রয়েছেন। অপেক্ষা করছেন খাবারের জন্য। দেখে হয়তো মনে হবে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে এসব মানুষ খাবার খেতে এসেছে। আসলে এরা বগুড়া শহরের অসহায়, ছিন্নমূল, ভিক্ষুক অভাবী মানুষ। প্রতিদিন গভীর রাতে এখানে বিনা মূল্যে অসহায়দের খাবার বিতরণ করেন বগুড়ার আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট। সেই খাবার খেতেই তারা গভীর রাতে বসে রয়েছেন।

প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ মানুষ এই খাবার খেয়ে থাকে। করোনা ভাইরাস, বন্যা, হরতাল, অবরোধ বলে কোনো কথা নেই। মহামারি করোনা ভাইরাসের মধ্যেও এই কার্যক্রমে ছেদ পড়েনি। তাদের ব্যবসা বাণিজ্য স্থবির। অনেক মানুষ কর্মহীন। ব্যবসা না থাকার পরেও ঠিক নিয়ম অনুযায়ী বগুড়া শহরের অভাবী, ছিন্নমূল মানুষের মুখে প্রতি রাতে খাবার তুলে দিচ্ছেন তারা। একেক দিন একেক ধরনের খাবার দেওয়া হয়। তারা কোনো দাম নেন না, কোনো কাজও করতে হয় না। যত লোকই বসবে প্রত্যেককে খাবার দেওয়া হয়। না খেয়ে কেউ ফিরে যাননি এখান থেকে।

আকবরিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. হাসান আলী আলাল বলেন, ‘বাবার নির্দেশ ছিল হোটেল থেকে আয়ের টাকায় তোমরা যদি এক বেলা খাও, তাদের জন্য এক বেলা খাবারের ব্যবস্থা করবে। হোটেলটি যতদিন থাকবে, ততদিন এটা করবে। বাবার নির্দেশ আমরা পালন করছি। এছাড়া শহরের ভেতরে যতগুলো মসজিদ আছে, সেই মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন ও খতিবদের তিন বেলা বিনা মূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করেছি।’  তিনি আরো বলেন, ‘আকবরিয়ার স্টাফদের জন্য যে খাবার রান্না করা হয়, সেই খাবার তাদেরও দেওয়া হয়। আমার দাদা খোশজান আলীর নামে শহরে ৮০টির মতো মক্তব আছে। যেখানে কোরআন ও নামাজ শিক্ষা দেওয়া হয়। আবার আকবরিয়া কেয়ার ফাউন্ডেশন গঠন করেছি আমরা। এটিরও কাজ চলছে। কেয়ার ফাউন্ডেশনের মূল কাজ হলো ছিন্নমূল-অসহায় গরিবদের বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা। মানুষকে কর্মক্ষম করা।

শহরের ফুটপাতের বৃদ্ধ ভিক্ষুক জাবেদ আলী জানান, সারা দিন ভিক্ষা করে যা পান তা দিয়ে তার দিন চলে আর রাতে তিনি আকবরিয়া হোটেলের খাবার খেয়ে ঘুমান। রোজার সময় তিনি আকবরিয়া হোটেলের দেওয়া সেহরি খেয়ে রোজা রাখেন। তিনি জানান, আকবরিয়া হোটেলে ভালো মানের খাবার দেয়। ভাতের সঙ্গে মাছ, মাংস, সবজি, ডাল, আলুঘণ্ট, শাক ইত্যাদি থাকে খাবারের মেন্যুতে।