বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বাইডেন প্রশাসনের নতুন চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২১, ২১:৪৪

আমেরিকার বিগত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পূর্ব ও পরবর্তী ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বরাজনীতিকদের দৃষ্টি এখনো প্রেসিডেন্ট বাইডেনের কার্যক্রমের দিকে নিবন্ধিত আছে। পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত কার্যক্রম, বিশেষ করে বিশ্বরাজনীতির নেতৃত্বের ভূমিকা থেকে আমেরিকাকে সরিয়ে নেওয়ায়, বাইডেন প্রশাসনের ক্ষমতায় আসাকে বিশেষভাবে স্বাগত জানিয়েছে রাজনৈতিক বিশ্ব। আমেরিকার বন্ধুপ্রতিম দেশ ও এলাইসহ বহিঃবিশ্বের প্রাপ্তির প্রত্যাশাও ছিল আকাশসম। বাইডেন প্রশাসনের দুই বছর পূর্ণ হবে, অল্প কদিন পর। অথচ দ্বিতীয় বাজেট সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাশ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা হয়নি। সরকার চলছে কন্টিনিউয়িং রেজ্যুলেশনের (খণ্ডকালীন বাজেট) মাধ্যমে।

ডিসেম্বরের মধ্যেই বর্তমান বছরের বাজেট পাশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দফায় দফায় নিজ দলের সিনেটর ও কংগ্রেস ম্যানদের সঙ্গে বৈঠক করেও সফল না হয়েই ইউরোপ সফরে গেলেন প্রেসিডেন্ট। নিজদলের মডারেটর গ্রুপের দুই শীর্ষ নেতা পশ্চিম ভার্জিনিয়ার সিনেটর জো মানচিন, ও এরিজোনার সিনেটর ক্রিস্টিন সিনেমা ধনীদের ট্যাক্স বাড়ানো এবং মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের জীবনমান বৃদ্ধির লক্ষ্যে অতিরিক্ত খরচের বিলে সম্মতি দিতে নারাজ। অন্যদিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী সিনেটর বার্নি সেন্ডারের নেতৃত্বে প্রোগ্রেসিভ গ্রুপও তাদের সমর্থিত নিম্নবিত্তের অবস্থার উন্নতিকল্পে অতিরিক্ত খরচের বিলে সম্মতি না দেওয়ায় বাই পার্টিসান (দুই দলের সম্মতিপ্রাপ্ত) ইনর্ফ্রাস্ট্রকচার বিলে সম্মতি দিতে নারাজ।

২১ অক্টোবরের সিএনএন টাউন হলে বাইডেন ঠাট্টা করে বলেন যে, ডেমোক্রেটিক পার্টির ৫০ জন সিনেটরের প্রত্যেকেই প্রেসিডেন্ট। নিজ দলের এজেন্ডায় সবাইকে এক টেবিলে আনতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কথা বলছেন এক-এক করে সবার সঙ্গে।

আইনের ক্লাসে পড়েছিলাম যে, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ও ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অশেষ ক্ষমতার অধিকারী। তারা নারীকে পুরুষ ও পুরুষকে নারী করা ছাড়া বাকি সবকিছুই করতে করতে সক্ষম। কিন্তু বাস্তবে তা ভিন্ন। বিশেষ করে আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে তার অধিকাংশ কাজে কংগ্রেসের ওপর নির্ভর করতে হয় বা কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা করতে হয়। বিচারক, মন্ত্রী, রাষ্ট্রদূত, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগে কংগ্রেসের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকতে হয়। তদুপরি বাজেট অনুমোদনের একচ্ছত্র ক্ষমতা কংগ্রেসের আছেই। এক্ষেত্রে আমেরিকান কংগ্রেসের শত বছরের রেওয়াজ অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের বিশেষ পারসোনাল ক্ষমতায় বিরোধী দলের সিনেটর ও হাউজ মেম্বারদের, নিজেদের কনস্টিটিউয়েন্টদের বিশেষ সুযোগ প্রদানের বিনিময়ে সংবিধান এবং সমঝোতার কথা বলে প্রেসিডেন্টে তার নিজের পক্ষে নিতে সক্ষম হোন। কিন্ত যে কারণেই হোক, এবার তা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। তাই প্রেসিডেন্টকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে, নিজ দলের সবাইকে একসঙ্গে রাখতে। ভালো বা খারাপ যা-ই বলেন, আমেরিকান রাজনীতির এটি একটি বিশেষ অনুষঙ্গ।

সমঝোতার রাজনীতির চ্যাম্পিয়ন প্রেসিডেন্ট বাইডেন শুরু থেকেই বাই পার্টিসান তথা দুই দলের সমঝোতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছিলেন। কংগ্রেসের প্রথম যৌথ অধিবেশনে বলেছিলেন, ‘We might not agree in everything, but let’s talk, we will find common ground’।

চাকরি সৃষ্টি ও কলকারখানা, স্থাপনের নিমিত্তে আনা ইনর্ফ্রোস্ট্রকচার বিল, সর্বনিম্ন মজুরি বৃদ্ধি, দারিদ্র্য দূরীকরণ, স্বাস্থ্যবিমা, জলবায়ু পরিবর্তন, ফ্রি প্রি-স্কুল, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের অবস্থার উন্নয়ন, ইমিগ্রেশন, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, পুলিশ রিফর্ম, হোয়াইট সুপ্রিমেসি, ডমিস্টিক টেরোরিজম, ও সিস্টেমেটিক রেসিসিজম ইত্যাদি বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে রিপাবলিকান নেতাদের প্রতি জোর আহ্বান রেখেছিলেন। সর্বনিম্ন মজুরি ১৫ ডলার করার অনুরোধ করে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, একজন পুরুষ বা নারীর সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজ করেও সন্তান নিয়ে অভাব-অনটনে থাকাটা বর্তমান সমাজের জন্য দৃষ্টিকটু ও অমানবিক। তিনি আরো বলেন, আমাদের একসঙ্গে কাজ করে প্রমাণ করতে হবে যে, গণতন্ত্র সঠিকভাবেই কাজ করছে।

তিনি আমেরিকার ২৬তম প্রেসিডেন্ট থিওডর রুজভেল্টের উক্তি ‘patriotism means stand by country, not by president’ স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘We need to tackle Russia and China. USA should not tolerate any interference with our election and should not silent when democracy and human rights are violated.’

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সফলভাবে ভয়াবহ করোনা মহামারি মোকাবিলা করে, অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার, নিরাপরাধ লোকজনের প্রাণহানি ও জীবনের নিরাপত্তাহীনতার দায়ে তার জনপ্রিয়তার অনুমোদনের রেট ৫৮/৫৯ থেকে নেমে এখন পঞ্চাশের নিচে চলে এসেছে। নজিরবিহীন সৃষ্ট নির্বাচনের প্রতি কারচুপির অভিযোগ আনা এবং ৬ জানুয়ারির নৃশংস অভূতপূর্ব ঘটনার পরও নিজ দলীয় কংগ্রেস ককাসের দ্বিধাবিভক্তির হুমকিতে পড়ে ২০২২ সালের বাজেট এখনো পাশ হয়নি। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি মোতাবেক হোয়াইট হাউজ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের রিসার্চ ও মতামতের ভিত্তিতে বিগত বছরের অতিরিক্ত খরচ অনুমোদন করে পরবর্তী বছরের জন্য পূর্ণাঙ্গ একটি বাজেট প্রণয়ন করার প্রস্তাব করা হলে শুরু হয় চুলচেরা বিশ্লেষণ। সবার সিনেটর, হাউজ সদস্যগণ নিজ ককাসের মতামত নিয়ে, নিজ এলাকার জনগণের (স্টেক হোল্ডারদের) সঙ্গে মতবিনিময় করে, শুরু করেন দর-কষাকষি। সিনেটর জো মানচীন ও ক্রিস্টিন সিনেমা হলেন রিপাবলিকান বা রেড স্ট্যাট থেকে নির্বাচিত। ঐ এলাকার ভোটারদের স্বার্থ ডেমোক্র্যাট ভোটারদের স্বার্থের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। অন্যদিকে নির্বাচনি তহবিল ও ডোনেশনের একটি বিষয় তো আছেই, যা তারা আমলে রাখেন।

সমঝোতার রাজনীতির পথিকৃত্ প্রেসিডেন্ট বাইডেন, ২৪ বছর বয়সে কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়ে সুদীর্ঘকাল সিনেটর ও দুই টার্ম ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতায় নিজ দলের দুই গ্রুপকে সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। মানুষের আকাশতম প্রত্যাশাকে সামনে নিয়ে মোকাবিলা করছেন পাহাড়সম সব বাধা। সর্বকালের প্রথাগত দ্বিদলীয় সমন্বয়ে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আজ বিরোধী দল সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। অথচ অতীতে তিনি নিজেই বিরোধী দলকে ঐ সময়ের রিপাবলিকান সরকারকে সাহায্য করতে সর্বদা স্বচেষ্ট ছিলেন। রাজনীতির কঠিন সময়ে চিরপরিচিত সহকর্মী, রিপাবলিকান নেতা মিট রমনি, মিচ ম্যাক্যনাল, লিন্ডজে গ্রাহামের মতো দীর্ঘকালের বন্ধুদের কাউকেই সঙ্গে পাচ্ছেন না তিনি। তাই তো নিজ দলের সবাইকে এক করতে তার প্রস্তাবিত ৬ ট্রিলিয়ন ডলারের স্পেনডিং বিল ও ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের ইনফ্রোস্ট্রাকচার বিলকে কমিয়ে দুটোর প্রত্যেকটিকেই প্রায় ২ ট্রিলিয়নে নামিয়ে এনেছেন। বিগত দিনে দেশের ৬৫০ জন বিলিনিয়র এক টাকাও ফেডারেল টেক্স না দিয়ে প্রত্যেকেই লাভ করেছে ট্রিলিয়নেরও বেশি। এ অবস্থার সমাপ্তি ঘটাতে এদের ২৬.৮ শতাংশ করপোরেট ট্যাক্স বসাতে সংকল্পবদ্ধ তিনি। বর্তমানে এটিও বাজেট সমঝোতা সংকটের মূল কারণের একটি। ডেমোক্র্যাট সিনেটর জো মানচিন ও ক্রিস্টিন সিনেমা বিলনিয়রদের ট্যাক্স বাড়াতে সম্মত নন। ৫০-৫০ সিনেটে ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের ভোটে ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকলেও সিনেটরদের নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দের দোলায় দুলছে ২০২২ সালের বাজেট।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামল ও নির্বাচন পরবর্তী ঘটনাক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে, আমেরিকার রাজনীতির যে কালো বিভীষিকা বা ভাঙনের ইঙ্গিত দেখছিল বিদেশি ভাসা ভাসা রাজনৈতিক গবেষক ও টকশো বিশেষজ্ঞরা, বাস্তবে তা না হলেও আমেরিকার শত বছরের সমঝোতার রাজনীতির ঐতিহ্য ভেঙে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের রিপাবলিকান বন্ধুরা নিজ দলে অস্তিত্বহীনতার সংকটে পড়ার ভয়ে তাকে এড়িয়ে চলছেন, এটা পরিষ্কার। তদুপরি ফেডারেল সরকারের কর্তৃত্ব বাস্তবায়ন, শিক্ষায় বৈষম্য নিরসন, গৃহযুদ্ধকে মোকাবিলা, কৃতদাস প্রথা বাতিল ও সর্বশেষ সেপ্টেম্বর-ইলেভেনের মতো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করে আসা আমেরিকান নেতৃত্বের সুযোগ্য উত্তরসূরি আজকের প্রেসিডেন্ট বাইডেন আগের চেয়ে আরো বেশি তত্পর, শক্তিশালী ও স্বতঃস্ফূর্ত।

ডেমোক্রেটিক দলের প্রোগ্রেসিভ ও মডারেটর ককাসের অভ্যন্তরীণ দর-কষাকষিতে বাইডেনের ক্যারিশমেটিক নেতৃত্ব আপাতত হোঁচট খেলেও তার সুদৃঢ় ও প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বে সব বাঁধা অচিরেই কেটে যাবে বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা ধারনা দিচ্ছেন।

লেখক: সোশ্যাল সিকিউরিটি আইন বিশেষজ্ঞ, যুক্তরাষ্ট্র ফেডারেল সরকারে কর্মরত

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন