বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মুক্তিযুদ্ধের স্মারক

কপোতাক্ষ পাড়ের বধ্যভূমি

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ১৮:৩৩

স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গড়তে, পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান পেতে আর এদেশের মা, মাটিকে মুক্ত করতে লড়েছিল বাংলার মুক্তিকামী দামাল ছেলেরা। ঝাঁপিয়ে পড়েছিল  স্বাধীনতা যুদ্ধে। সেই ধারাবাহিকতায় এদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা সাতক্ষীরাতেও ঘরে ঘরে গড়ে তোলা হয়েছিল দূর্গ। 

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এ দেশকে শত্রুমুক্ত করতে সাতক্ষীরার বীর সন্তানেরা অন্তত ৫০টি ছোট-বড় যুদ্ধে হানাদার বাহিনীকে মোকাবেলা করেছিল। তৎকালীন সময়ে মুক্তিযুদ্ধের এ আন্দোলনকে বেগবান করার লক্ষ্যে এবং সুষ্ঠু পরিচালনার স্বার্থে যে সেক্টর ভাগ করা হয়েছিল তার মধ্যে সাতক্ষীরার অংশে ছিল ৮ ও ৯ নং সেক্টর। এই দুই সেক্টরেই মুলত যুদ্ধ হয়েছিল ভারত এবং সুন্দরবনের গা ঘেঁষে গড়ে উঠা এ জনপদে। 

যুদ্ধের নেতৃত্বে একাধিক মানুষের অবদান থাকলেও ক্যাপ্টেন শাহজাহান মাস্টার, স ম আলাউদ্দিন, মমতাজউদ্দিন (এমপি), শেখ আমানুল্লাহ, সৈয়দ কামাল বখত সাকীর (এমপি) উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। সে সময় ৮ নং সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন মেজর মঞ্জুর আর ৯ নং সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন মেজর জলিল ও মেজর জয়নাল আবেদিন।

সময়টা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। এ দিনটি বাঙালি জাতির জীবনে অভিশপ্ত, দুঃখের, বেদনার একটি দিন। সেদিন বাঙালির মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারকে হত্যা করা হয়। এর ঠিক চার বছর আগে একই তারিখের রাতে রাজাকার, আলবদর ও পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জালালপুর গ্রামের ইউনিয়ন পরিষদের সামনে কপোতাক্ষের পাড়ে বধ্যভূমিতে নাম জানা ১৮ জনসহ অনেক নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। 

এ উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি সংরক্ষণ কমিটির নেতৃবৃন্দ জানান, ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট রাতে তালা উপজেলার জালালপুর গ্রামে শহীদ হন  অন্নদা সেন, আছিয়া বিবি, অনিমা দাশ, দিপংকর দাশ, দুলাল চন্দ্র বর্ধন,  হরিপদ ঘোষ, অধীর চন্দ্র ঘোষ, সাহেব সেন, উমাপদ দত্ত, বাদল প্রামাণিক, অশোক প্রামাণিক, মোবারক মোড়ল, শ্রীমন্তকাটি গ্রামের শহীদ আবদুল বারী, কৃষ্ণকাটি গ্রামের বদির শেখসহ নাম না জানা আরও অনেকেই।

এরপর সাতক্ষীরা ৭ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হলো। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করলো এদেশের মানুষ। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শহীদদের স্মরণে বধ্যভূমিতে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়নি। তবে তালা উপজেলাসহ জালালপুর ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি সংরক্ষণ কমিটি এই বধ্যভূমিতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবী জানিয়ে আসছিল। 

ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধাগণ ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি সংরক্ষণ কমিটির কমিটির দাবির প্রেক্ষিতে ২০০৭ সালে তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান সরদার রফিকুল ইসলাম ইউনিয়ন পরিষদে একটি রেজ্যুলেশন করেন। ইউনিয়ন পরিষদের সামনে পতাকা স্ট্যান্ডের পাশে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করেন। তারপর থেকে সরকারিভাবে এই স্মৃতিফলকের বেদিতেই স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। 

এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ (২য় পর্যায়ে) শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে কপোতাক্ষ পাড়ের সেই অরক্ষিত গণকবরটি সংরক্ষণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন অরক্ষিত থাকা জালালপুর এ বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ রূপ নেওয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা আনন্দ প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ নির্মাণাধীন এ-স্মৃতিস্তম্ভ দেখতে আসছেন।

তবে এই স্মৃতিস্তম্ভের চারপাশে রয়েছে সরকারি সম্পত্তি। এর মাধ্যমে স্মৃতিস্তম্ভের পরিধি বাড়াতে পারলে বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা মানুষের সমাগম আরও বাড়বে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা। পাশাপাশি শুধু তালা উপজেলার জালালপুর বধ্যভূমি নয়, সাতক্ষীরার অন্যান্য বধ্যভূমির গণকবরগুলোও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। কারণ অযত্নে আর অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে কয়েকটি বধ্যভূমি ও গণকবরের স্মৃতিচিহ্ন। যথাযথ সংরক্ষণ না করা হলে এগুলো হারিয়ে যাবে। তাই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে দেশের বীর সন্তানদের আত্মত্যাগের কথা তুলে ধরতে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়ার দাবি সকলের।

লেখক: রিয়াদ হোসেন, শিক্ষার্থী, সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন