বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের 'মুক্ত বাংলা' ভাস্কর্য

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:১৯

দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ শেষে বিজয় মিছিল নিয়ে ঘরে ফিরেছিল বাংলার দামাল ছেলেরা। মুখে স্লোগানের সাথে হাতে ছিল উঁচিয়ে রাখা রাইফেল। যে রাইফেল বিজয়ের স্বীকৃতি দেয়। তেমনই দৃঢ় মুষ্টিবদ্ধ হাতে রাইফেল তুলে ধরে প্রতি মুহূর্তে বিজয়ের সাক্ষ্য দিয়ে চলছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) অবস্থিত স্মারক ভাস্কর্য ‘মুক্ত বাংলা’। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই ডানে তাকালে চোখে পড়বে দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্যটি। 

ক্যাম্পাসে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি ভাস্কর্য থাকবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এ দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। এর প্রেক্ষিতেই ১৯৯৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ ইনাম উল হক স্মারক ভাস্কর্য মুক্ত বাংলার উদ্বোধন করেন। খ্যাতিমান স্থপতি রশিদ আহমেদের নকশার ভিত্তিতে স্থাপিত হয় অপরূপ শিল্পকর্মটি।

ভাস্কর্যটির শীর্ষে রয়েছে দৃঢ় মুষ্টিতে ধরা একটি রাইফেল। যা দাঁড়িয়ে আছে সাতটি স্তম্ভের উপর। মুজিবনগরে গঠিত সাত সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রীসভা স্মরণেই সাতটি স্তম্ভ। প্রতিটি স্তম্ভ বিমূর্ত হাত ধরাধরি করে উল্লোসিত অবয়বে ইসলামী স্থাপত্যভিত্তিক আর্চ রচিত। চোখে লাল সূর্য উদয়ের প্রত্যাশা, সর্বনিম্নে বিস্তৃত সিরামিক বড় ইট লাগাতার আন্দোলনের নির্দেশক। উপর থেকে চতুর্থ ধাপে লাল সিরামিক ইট আন্দোলন ও যুদ্ধের প্রতীক, দ্বিতীয় ধাপে কালো পাথর শোক ও দুঃখের প্রতীক, তৃতীয় ধাপে সন্ধি ও যোগাযোগের প্রতীক হিসেবে বসানো হয়েছে সাদা মোজাইক। 

MuktoBanglaIBI

বেদির মূল মেঝে সবুজ মোজাইক নীল টাইলস। যা শান্তি নির্দেশক। স্বাধীনতার পর বাংলার মানুষের মধ্যে যে স্বস্তি ফিরে এসেছিল তা বুঝাতে নীল টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে। সম্পূর্ণ অবকাঠামোটি সাতটি আর্চ সংবলিত একটি অর্ধ উদিত সূয। বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম বাংলাদেশ শত্রু মুক্ত হওয়ায় ভাস্কর্যটির নামকরণ করা হয় ‘মুক্ত বাংলা’। ভাস্কর্যে প্রবেশ পথে একটি বৃত্তাকার কালো প্লেটে এর নির্মাণশৈলীর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

আধুনিক স্থাপত্য শিল্পের আঙ্গিকে স্থাপিত ভাস্কর্যটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মনে প্রতিনিয়ত মুক্তিযুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তুলে ধরে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস। বিজয়ের বার্তা জানিয়ে উদ্বুদ্ধ করে স্বাধীনতার চেতনায়। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্য ছাড়াও ভাস্কর্যটির সৌন্দর্য ও বিশেষত্ব উপভোগ করতে প্রতিদিন অসংখ্য ভ্রমণপ্রিয় মানুষের আগমন ঘটে ক্যাম্পাসে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইতিহাস সম্পর্কে জানাতে শিক্ষা সফরে আসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ভাস্কর্যের পাশে থাকা বসার জায়গাগুলো পরিণত হয়েছে শিক্ষার্থীদের মিলনকেন্দ্রে। চারপাশের ফুলগাছগুলো এর সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলেছে কয়েক গুণ। 

মুক্ত বাংলা নিয়ে অনুভূতি জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী মুন্সি কামরুল ইসলাম অনিক বলেন, মুক্ত বাংলা আমাদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাগরুক করে রাখে। এটি শুধু একটি ভাস্কর্যই নয় আমাদের বিজয়ের প্রেরণা। এর দিকে দৃষ্টি পড়লেই আমাদের চোখে মুক্তিযুদ্ধের চিত্র ভেসে উঠে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এ ভাস্কর্যটি সারাবছর অব্যবস্থাপনায় থাকে যা কষ্ট দেয়। এ ব্যাপারে প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করছি। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক কোষাধ্যক্ষ ও আইন বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. সেলিম তোহা বলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৭৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘদিনেও স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চিহ্নিত কোনো স্মৃতিস্তম্ভ বা ভাস্কর্য ছিলনা। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষকরা মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক একটি ভাস্কর্য স্থাপনের দাবি জানাই। এর প্রেক্ষিতেই মুক্ত বাংলা স্থাপন করা হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীরা যেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস জানতে পারে এবং তাঁদের মাঝে যেন দেশপ্রেম জাগ্রত হয় এ লক্ষ্যেই আমরা এ দাবি জানিয়েছিলাম। পরে ক্যাম্পাসে ভাষা শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ স্থাপিত হয়েছে এবং সর্বশেষ প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতে সামনে জাতির পিতার ম্যুরাল ‘মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব’ স্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যদিয়ে কেউ ক্যাম্পাসের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকে ডানে বামে তাকালেই এই স্থাপনাগুলো চোখে পড়বে ফলে তাদের মাঝে দেশপ্রেম জাগ্রত হবে।’

লেখক: মুনজুরুল ইসলাম নাহিদ, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন