কেমন হয় অটিস্টিক শিশুরা

আপডেট : ১৩ মে ২০১৩, ২১:২৪
অটিজমের কারণ, কেমন হয় অটিস্টিক শিশুরা, তাদের লক্ষণ কি, তাদের পছন্দ কেমন, শিক্ষাসুযোগ, এদের শিক্ষাদান পদ্ধতি কেমন হবে প্রভৃতি বিষয়ে এখনও জিজ্ঞাসার অন্ত নেই। সাম্প্রতিক সময় আমাদের দেশে অটিজম নিয়ে আলোচনা শোনা গেলেও সাধারণের কাছে ক্ষেত্রটি এখনও অপরিচিত। তবে আমাদের দেশে কেন, পাশ্চাত্যে এদের নিয়ে অজানা জনসংখ্যা কম নেই। বিভিন্ন তথ্য ও কিছু সেমিনার এবং প্রচার মাধ্যমে এরই মধ্যে জানা গেছে বাংলাদেশে এ ধরনের শিশুসংখ্যা একেবারে কম নেই। বিভিন্ন গবেষণা তথ্য থেকে জানা যায়, বিশ্বব্যাপী ১৯৯০ সালের গোড়ার দিকে এদের সংখ্যা প্রতি ১০,০০০ জনে ১ জন, ২০০৯ সালে ১৫০ জনে ১ জন থাকলেও বর্তমানে প্রতি ১০০ জনে ১ জনের কথা বলা হয়। অতি সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা যায়, বিশ্বের কিছু দেশে এদের সংখ্যা প্রতি ৮৮ জনে ১ জন। উল্লেখ্য যে, এদের উপস্থিতি ও বিন্যাস জাতি-ধর্ম-গোত্রভেদে ভৌগোলিকভাবে বিশ্বজুড়েই বিদ্যমান। বিশেষজ্ঞদের মতে, অটিজম এক ধরনের জটিল স্নায়ুবৈকল্য বা কম্প্লেক্স নিউরোলজিক্যাল ডিজঅডার্স। এ ধরনের বৈকল্যে ব্যক্তির মধ্যে কমিউনিকেশন বা কথাবার্তা, বলা-কওয়ার মাধ্যমে যোগাযোগে ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় বৈকল্যসহ আচরণ, আগ্রহ, শখ এবং কর্মকাণ্ডে অস্বাভাবিকতা ও অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়। সেইসংগে কিছু অঙ্গের যেমন, হাত, মাথা, নড়াচড়ায় পুনরাবৃত্তি, শারীরিকভাবে কোলাকুলি বা কাছাকাছি হওয়ায় অনভ্যস্ত, হঠাত্ বা ব্যাখ্যাবিহীন কারণে রেগে যাওয়া, খেলাধুলায় অনীহা কিংবা স্বল্প বা কম চোখাচোখি হওয়া প্রভৃতিতেও অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ের অধিকাংশ গবেষণায় জানা যায়, দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই শিশুর মধ্যে অটিজমের লক্ষণ প্রকাশ পায়। কিছু গবেষণায় বলে, ছয় মাসের মধ্যেই মা-বাবা শিশুর অটিজম সংক্রান্ত কিছু অসঙ্গতি বুঝতে পারেন। কেনেডি ক্রিগের, জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় এবং হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের একদল গবেষক তাদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় প্রকাশ করলে, একই বয়সে সব অটিস্টিক শিশুর অটিজম চিহ্নিত নাও হতে পারে। এজন্য তাদের উপদেশ- অটিজম নির্ণয়ের জন্য চিকিত্সকদের শিশুর বৃদ্ধিকালীন সময় এক বছর, চৌদ্দ মাস স্ক্রিনিং করা দরকার। এভাবে স্কুলপূর্ব সময় পর্যন্ত নিয়মিত স্ক্রিনিং করা দরকার। বৈশিষ্ট্যগতভাবে দু’জন অটিস্টিক শিশুর মধ্যে একই ধরনের বৈশিষ্ট্য নাও থাকতে পারে; একজন অন্যজন থেকে ভিন্ন হতে পারে। তবে দু’টি শিশুই অটিস্টিক। অনেকগুলো প্রচলিত স্ব-উদ্দীপক আচরণ (Common self-stimulatory behaviors) দেখা যায় এদের মধ্যে। যেমন, দেহ বা মাথা দোলানো বলতে গেলে অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে কমন। কেউ হয়তো মাথা দোলায় সামনে- পেছনে, কেউ ডানে-বামে। অনেক অটিস্টিক শিশু বা যুবক জাম্প দেয় বা বাউন্স করে। কারও মধ্যে মাথা ঠোকানো, হাত ঝাপ্টানো, বিভিন্নভাবে হাতের আঙ্গুল ঘোরানো বা ঝাড়ানো দেয়া যায়। অনেকে আবার চোখের সামনে আঙ্গুল ঘোরায়, গোলাকার জাতীয় বস্তু ঘোরায়, স্বাভাবিক আলোর চেয়ে বেশি হলে চোখ বন্ধ করে বা পলক ফেলে না। এদের কেউ রাবার জাতীয় বস্তু আঙ্গুলে পেঁচায় বা ঘোরায়, বাল্বের সুইচ অফ-অন করে সুইচের আলোর মিটমিট দেখে, শব্দের পুনরাবৃত্তি করে। অনেকে নিজের মনেই বিড়বিড় করে। এর সঙ্গে এও দেখা যায়, এদের কেউ কেউ হাঁটার সময় সিঁড়ির কার্নিশ ধরে ধরে হাঁটে। কেউ কেউ হাঁটার পথে থেমে থেমে হাঁটে বা চলার পথে বৃত্ত করে দু’-একটি পাক দেয় বা ঘোরে এবং আড়চোখে এদিক-সেদিক তাকায়। এ সময় পথে কোন চেনা বা পরিচিত কিছু পড়লে সেটি বারবার বিড়বিড় করে বলতে থাকে। যেমন, চলন্ত বস্তুর দিকে তাকিয়ে থাকে, কোন রেল বা রেলপথ অথবা স্ট্রিটকার চোখে পড়লে বলতে থাকে ‘ট্রেন, ট্রেনলাইন অথবা স্ট্রিটকার, স্ট্রিটকার ইত্যাদি। একই শব্দ এবং বাক্যাংশ বারবার পুনরাবৃত্তি করে। ভুলভাবে ভাষা ব্যবহার করে, যেমন- ব্যাকরণগত ত্রুটি, ভুল শব্দ ব্যবহার প্রভৃতি। এদের কেউ কেউ গোড়ালি উঁচিয়ে পায়ের অগ্রভাগে ভর করে হাঁটে। কেউ কেউ দাঁত কাটে, চুইংগাম জাতীয় বস্তু চিবায়। খাবারের পছন্দে দেখা যায় হরেক রকমের পছন্দ-অপছন্দ। একজনের একসময় দেখা যায় সে শুধু দই খেতে পছন্দ করছে। এর ব্যত্যয় ঘটতেই মেজাজী হতে দেখা যায় তাকে। তবে যে কাজটি সে পছন্দ করে সে কাজটি এরা দক্ষতার সাথে করে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এদের মধ্যে বেশ কিছু লক্ষণ দেখা যায়। তবে এসব লক্ষণের মধ্যে ভাল-খারাপ দু’টিই আছে। শৈশবকালীন সময়ে কথাবার্তায়, খেলাধুলায়, ভাষায় পরিবর্তন আসে, বিশেষ করে তের বছরের পর থেকে। তবে অন্যদের তুলনায় এই বয়সের পর থেকে বয়োঃসন্ধি এবং যৌন বিষয়ের জন্য এই বয়স অটিস্টিকদের জন্য কঠিন সময়। এছাড়া বিষাদ, উদ্বেগ এবং মৃগীরোগ প্রভৃতি ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়ে। সাবালকত্বকালীন সময়ে অনেক অটিজমের ব্যক্তিরা নিজেদের কাজ নিজেরা করতে পারেন। অনেকে তাদের ক্ষমতা ও দক্ষতা অনুসারে স্বাধীন জীবনযাপনের সক্ষম হয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়- অন্তত শতকরা ৩৩ জন আংশিক স্বাধীন জীবনযাপনে সক্ষম হয়। শিশুর অটিজম নির্ণয়ের পর তার যাবতীয় দিকে মা-বাবাসহ সমাজ,সরকার সকলের প্রচষ্টা এখানে সুফল বয়ে আনতে পারে। বর্ণিত এ সকল অবস্থার প্রেক্ষিতে মাতা-পিতাসহ সরকার সকলের ভাবনার বিষয়। অটিস্টিকদের নিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মা-বাবা, ডাক্তার এবং বিশেষজ্ঞদের মধ্যে রয়েছে নানা মতামত। তবে একটি বিষয়ে এদের সকলেই একমত যে, কম বয়েসে এদের সমস্যা নিরূপণ করতে পারলে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে সহজ হয়। এজন্য অটিজমের লক্ষণ নির্ণয়ে মা-বাবাকেই ধরা হয় প্রথম নির্ণায়ক। নিয়মের মতো করে বলা যায়- মা-বাবার সুতীক্ষ্ন পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এজন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভয়, অপেক্ষা ও বিলম্ব না করে চেষ্টা করাই হবে সময়োপযোগী পদক্ষেপ। সঠিকভাবে নির্ণয়ের জন্য অগ্রসর হওয়াই হল বুদ্ধিমানের কাজ। করণীয় হিসেবে শিশুবিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়াই প্রথম কাজ। শিশুবিশেষজ্ঞই হতে পারেন এক্ষেত্রে একজন গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক। শিশুবিশেষজ্ঞের সাথে দ্বিমত হলে নিজের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্বাসে স্থির ও ধীর থেকে দ্বিতীয় উপায়ের কথা ভাবতে হবে। আমাদের মতো দেশে দ্বিতীয় উপায়ের ভাবনায় পদক্ষেপ নেয়া সহজ হয় না বরং খানিকটা কঠিন। কারণ, বাংলাদেশে এখনও অটিজম ও অন্যান্য প্রতিবন্ধিতা নিয়ে খুব করে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তাছাড়া রয়েছে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞের অভাব। তাই এজন্য দরকার জনগণের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলা। সেইসঙ্গে দরকার এদের সমাজের বিভিন্ন কাজে সংশ্লিষ্ট করা। আর এ কাজটি করতে হলে দরকার হবে এদের শিক্ষাদানের ব্যবস্থার। কেননা শিক্ষা ব্যবস্থায় রয়েছে নানা স্ট্র্যাটেজি যাতে তারা নিজেকে দক্ষ করে তুলতে পারে। এই স্ট্র্যাটেজিতে মা-বাবা, শিক্ষক, ডাক্তার, থেরাপিস্ট সকলের পরিকল্পনা, উপদেশ সেসব পথকে সুগম করতে পারে। তবে সাম্প্রতিক সময়ের সরকারি পদক্ষেপ ও অটিজম নিয়ে ভাবনা এ বিষয়ে ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্বাস। লেখক: টরেন্টোবাসী, সাবেক অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, নটরডেম কলেজ, ঢাকা