শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সফুরা খাতুন : ভাওয়াইয়া গানের এক অনন্যা নারী গীতিকার

আপডেট : ৩০ মে ২০২২, ১০:৩৯

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এ দেশের আপামর জনসাধারণ পরাশত্রুর হাত থেকে ছিনিয়ে এনেছিল আজকের লালসবুজের পতাকা। এর পেছনে রয়েছে রক্তাক্ত ইতিহাস; সেই ইতিহাস স্বাধীনতার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিজের মধ্যে ধারণ করে বর্তমান প্রজন্মের ভাওয়াইয়া নারী গীতিকার সফুরা খাতুন সেই ইতিহাস, ঐতিহ্যকে বাণীবদ্ধ করেছেন অনবদ্য সৃষ্টি ভাওয়াইয়া গানে।

সফুরা খাতুন (১৯৮৫) রংপুর শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরবর্তী খটখটিয়া গ্রামে বেড়ে ওঠা এক নিভৃতচারী নারী। যার উত্তরাঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্যের সঙ্গে রয়েছে আত্মিক সম্পর্ক। মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী থাকাকালীন সাহিত্য, সংস্কৃতির সঙ্গে গড়ে ওঠে তার সখ্য। তিনি একাধারে কবি, ছড়াকার, গল্পকার, উপস্থাপক এবং গীতিকার। ছড়া, গল্প, কবিতা রচনা করলেও ভাওয়াইয়া গানের প্রতি ছিল তার প্রবল অনুরাগ। এ প্রসঙ্গে সফুরা খাতুন বলেন, ‘আমার জন্ম ভাওয়াইয়ার আকড় ভূমিতে। এ গানের ভাব, ভাষা আমাকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে। এই আকর্ষণ থেকেই মূলত ভাওয়াইয়া গানে অনুপ্রবেশ।’ সফুরা খাতুন ভাওয়াইয়া গানের নারী গীতিকার হিসেবে বাংলাদেশ বেতার, রংপুরে তালিকাভুক্ত হন ২০১৯ খৃষ্টাব্দে। তিনি এখন পর্যন্ত ১০০-র অধিক ভাওয়াইয়া গান রচনা করেছেন। তার গানের প্রধান উপজীব্য বিষয় হলো—নারী বিরহ, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, দেশপ্রেম, শোষণ-বঞ্চনা প্রভৃতি। এমনকি সমাজ বিবর্তনের ধারাকেও তিনি গানের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন ভিন্ন আঙ্গিকে। যেমন—অটো এখান কেনো পতিধন, অটো এখান কেনো/দেও ব্যাচেয়া ধ্যারধ্যারা ঐ বুড়া ইস্কাখানো।

আবহমান কাল থেকেই গ্রামীণ জনসাধারণের জীবনযাপনে, সুখে-দুঃখে, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, মান-অভিমান, অভাব-অনটন প্রভৃতিরই যেন প্রকাশ মাধ্যম হয়ে উঠেছে ভাওয়াইয়া। শুধু তাই নয়, এই গানে আছে পল্লির জল, মাটি, হাওয়ায় বেড়ে ওঠা লোকায়তজনের নিজস্ব ভাববিলাসী মনের গোপন কথা, আছে নিত্যদিনের সামাজিক, পারিবারিক জীবনের কথা। এই অনুষঙ্গগুলোর প্রধান উপজীব্য হয়েছে নারী। অথচ এই গানের রচয়িতা হিসেবে আমরা শুধু পুরুষকেই পেয়ে থাকি। আজ সর্বত্রই পরিবর্তন লক্ষণীয়। এই পরিবর্তনের ধারায় বর্তমানে ভাওয়াইয়া গানের নারী গীতিকার হিসেবে আমরা সফুরা খাতুনকে পাই। যিনি নিঃসন্দেহে ভাওয়াইয়া গানের এক অনন্যা স্রষ্টা। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ২০০০ সালের পূর্ব পর্যন্ত একজন গীতিকার বেতারে তালিকাভুক্ত হলে সব ধারার গান লিখতে পারতেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে প্রতিটি বিষয়ের জন্য আলাদা আলাদা বিষয়ে তালিকাভুক্ত হতে হয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, সফুরা একমাত্র ভাওয়াইয়ার নারী গীতিকার, যার আগে কোনো নারী গীতিকারের রচিত ভাওয়াইয়া গান বাংলাদেশ বেতারে প্রচার হয়নি। এ প্রসঙ্গে ভাওয়াইয়ার প্রখ্যাত শিল্পী পঞ্চানন রায় বলেন, ‘সফুরা ভাওয়াইয়ার একমাত্র নারী গীতিকার, যিনি ২০১৯ খৃস্টাব্দে শুধু ভাওয়াইয়া গানের জন্য গীতিকার হিসেবে নির্বাচিত হন এবং নারী গীতিকার হিসেবে তার গান বাংলাদেশ বেতারে নিয়মিত প্রচারিত হচ্ছে।’

বাংলাদেশ বেতার, রংপুরের আঞ্চলিক পরিচালক ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ নারী গীতিকার হিসেবে সফুরা খাতুনকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন- ‘ভাওয়াইয়া গানের অধিকাংশ স্থান জুড়ে রয়েছে নারী। অথচ এ গানের রচয়িতা হলেন পুরুষ। একজন নারী গীতিকার জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে যেভাবে গানের মাধ্যমে নিজের ভাবাবেগকে প্রকাশ করতে পারেন, সে জায়গা থেকে হয়তো একজন পুরুষের পক্ষে ততটা সহজ নয়। আমি মনে করি, সে বিবেচনায় বর্তমান সময়ের নারী গীতিকার হিসেবে সফুরা সফল। তিনি একজন প্রতিশ্রুতিশীল গীতিকার। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি নিজেকে ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করে চলছেন।’ আরেকজন প্রখ্যাত ভাওয়াইয়া শিল্পী, সুরকার শফিকুল ইসলাম সফুরা খাতুন সম্পর্কে বলেন, ভাওয়াইয়ার নারী গীতিকার হিসেবে সফুরা আপার গান সুর করা আমার জন্য চরম সৌভাগ্যের। তার গানের গল্প, ধারা বর্ণনা, ভাষার ব্যবহার সত্যিই অসাধারণ। আমি আমার জীবদ্দশায় সফুরা খাতুনের গানের মধ্যে যে ছন্দ, উপমা, অনুপ্রাস খুঁজে পেয়েছি যা অনেক প্রখ্যাত গীতিকারের গানের মধ্যেও সেটা পাইনি।’

সর্বোপরি ভাওয়াইয়া গানের নারী গীতিকার হিসেবে সফুরা খাতুনের আবির্ভাব ভাওয়াইয়া গানের জন্য আশীর্বাদ। তিনি ভাওয়াইয়া গানকে আরো একধাপ এগিয়ে নেবেন বলে দৃঢ় বিশ্বাস। তার এই যাত্রা শুভ হোক, তারই হাত ধরে ভাওয়াইয়া দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের দরবারে স্থান লাভ করুক সেই প্রত্যাশাই অবিরত।

লেখক: লোকসংস্কৃতি গবেষক ও প্রাবন্ধিক

ইত্তেফাক/ ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন