রোববার, ০৭ আগস্ট ২০২২, ২৩ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

৫৪০ বছর পুরনো মুন্সীগঞ্জের বাবা আদম মসজিদ

আপডেট : ২৪ জুন ২০২২, ১২:১৪

মুন্সীগঞ্জের বাবা আদম মসজিদ একটি ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। বাবা আদম নামে এক ব্যক্তি মধ্যপ্রাচ্য থেকে এখানে এসেছেন ইসলাম প্রচার করতে। তিনি এক যুদ্ধে মারা গেলেও পরে তাঁর স্মরণে সুলতান জালালুদ্দিন ফতেহ শাহের শাসনামলে মালিক কাফুর মসজিদটি নির্মাণ করেন।

মুন্সীগঞ্জের সদর উপজেলার মিরকাদিম পৌরসভার দরগা বাড়ি গ্রামে এর অবস্থান। ৬ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটির নির্মাণশৈলী চমত্কার। ভবনটির দৈর্ঘ্য ৪৩ ফুট, প্রস্থ ৩৬ ফুট, দেয়ালগুলো প্রায় ৪ ফুট চওড়া। উত্তর-দক্ষিণে লম্বা, সামনে খিলান আকৃতির একটি প্রবেশপথ রয়েছে। আর দু’পাশে রয়েছে সমান আকারের দু’টি জানালা। প্রবেশপথের ওপরে ফারসি অক্ষরে খোদাই করে কালো পাথরের ফলক লাগানো। 

মসজিদটির মূল দেয়াল থেকে সামনের দিকে খানিকটা এগিয়ে এসে চার কোনায় চারটি স্তম্ভ ষড়ভূজ বিশিষ্ট। খিলান দরজা স্তম্ভের পাদদেশে, মাঝে এবং পূর্বে ইমারতে ছাদের কার্ণিশের তলা দিয়ে পাতলা ইট কেটে মুসলিম স্থাপত্যকলার নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তাছাড়া প্রবেশপথের দু’পাশে সামনের দেয়ালে ইটের ফলকে সুদৃশ্য কারুকাজ করা। এরকম কারুকাজ রয়েছে উত্তর-দক্ষিণ দিকের দেয়ালেও। শুধু সামনের দিকে দরজা জানালা ছাড়া দু’পাশে জানালা না থাকায় মসজিদটির ভেতরটা দিনের বেলায় বেশ আবছা। সব মিলিয়ে সুরক্ষিত দুর্গের মতে মনে হয় স্থাপনাটিকে। 

ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাবা আদম মধ্যপ্রাচ্য থেকে ১১৭৩ সালে তত্কালীন বিক্রমপুর পরগনার রামপালে এসেছিলেন ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে। তখন সেন রাজাদের রাজত্ব। বিক্রমপুরের মহাপরাক্রমশালী রাজা বল্লাল সেনের সঙ্গে বাবা আদমের যুদ্ধ বাধে। এ যুদ্ধের বিষয়ে অনেক কাহিনী প্রচলিত আছে। একটি কাহিনী এরকম- বল্লাল সেন যুদ্ধে যাওয়ার সময় তাঁর পোষা কবুতর সঙ্গে নিয়ে রওনা হন এবং বাড়ির স্ত্রী-কন্যাদের বলেন যদি কবুতর ফেরত আসে তাহলে বুঝতে হবে যুদ্ধে তাঁর পরাজয় ঘটেছে। এবং তারা সবাই যেন আগুনে আত্মাহুতি দেয়।

কিন্তু যুদ্ধে রাজার জয় হলো, ফিরতি পথে একটি পুকুরে রাজা যখন শরীরে লেগে থাকা রক্ত, ধুলা-ময়লা ধুয়ে নিচ্ছেলেন তখন হঠাৎ করে কবুতরটি উড়ে যায় রাজপ্রাসাদের দিকে। রাজা সমূহ সর্বনাশ ঠেকাতে ঊর্ধ্বশ্বাসে বাড়ির দিকে রওনা দিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। তাঁর পৌঁছানোর আগেই কবুতরটি পৌঁছে যায়। যুদ্ধে রাজার পরাজয় হয়েছে ভেবে নারীরা আত্মাহুতি দেন।

বাবা আদম যুদ্ধে মারা যাওয়ার তিন শতাব্দীর পর ১৪৮৩ সালে মসজিদটি নির্মিত হয়। সুলতান জালালুদ্দিন ফতেহ শাহের শাসনামলে মালিক কাফুর মসজিদটি নির্মাণ করেন এবং মসজিদের নাম রাখা হয় বাবা আদমের নামে। মসজিদটিতে এখনো নিয়মিত নামাজের জামায়াত হয়ে থাকে। স্থান স্বল্পতার কারণে সামনের প্রাঙ্গণে কংক্রিট ঢালাই করা হয় এবং প্রাঙ্গণসহ মসজিদ ভবনটি নিচু লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ পুরার্কীতি হিসেবে বাবা আদম মসজিদকে অধিভুক্ত করেছে। তবে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে এর আর কোন সংস্কার কাজ হয়নি।

বাংলাদেশের প্রথম ইসলাম প্রচারক বাবা আদমের স্মারক প্রাচীন মসজিদটির নির্মাণ কৌশল দেখার মতো। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের ডাক বিভাগ এই মসজিদের ছবি সংবলিত একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে। 

 

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

করোনায় বিশ্বব্যাপী পর্যটনের ক্ষতি সাড়ে ৪ ট্রিলিয়ন ডলার