যে পরিণতি হয়েছিল পলাশির যুদ্ধের বিশ্বাসঘাতকদের

আপডেট : ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০২:৩০

আজ থেকে ২৬৭ বছর আগে পলাশির আম্রকাননের যুদ্ধে বাংলা বিহার ওড়িশার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা (১৭৩২-১৭৫৭) কতিপয় বিশ্বাসঘাতকের ষড়যন্ত্রের কারণে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। ফলে প্রায় ২০০ বছরের জন্য স্বাধীনতা হারায় বাংলা। 

ইংরেজ ঔপনিবেশিক শক্তির কাছে এই ভূ-ভাগ গোলামির জিঞ্জিরে শৃঙ্খলিত হয়। সেই ইতিহাস নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ আজও সমসাময়িক। পলাশির প্রান্তরে উপমহাদেশের স্বাধীনতার সঞ্জিবনী শক্তি নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর কি ঘটেছিল সেই ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞাত প্রায় সবাই। 

তবে বিশ্বাসঘাতকদের ভাগ্যে কি পরিণতি ঘটেছিল—এনিয়ে মানুষের কৌতূহল অন্তহীন। ষড়যন্ত্রকারী ও বিশ্বাসঘাতকদের পরিণাম শেষ পর্যন্ত কখনো ভালো হয় না। পরকালের শাস্তি ভোগের আগেই দুনিয়াতেও তারা লাঞ্ছিত, অপমানিত এবং আত্মগ্লানিতে দগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করে। পলাশি বিয়োগাত্মক ষড়যন্ত্রকারী বিশ্বাসঘাতকদের বেলায়ও এই সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। 

নিউটনের তৃতীয় সূত্রে বলা হয়েছে, প্রত্যেক ক্রিয়ার সমমুখী ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এটা শুধু বস্তুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এমন নয়। সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে সমান প্রতিক্রিয়া। তা না হলে যুগে যুগে বিশ্বাসঘাতকদের মর্মান্তিক পরিণতি হবে কেন? ষড়যন্ত্রকারী ও বিশ্বাসঘাতকদের পরিণাম শেষ পর্যন্ত কখনো সুখকর হয় না। পরকালের শাস্তি ভোগের আগেই দুনিয়াতেও তারা অপদস্ত-লাঞ্ছিত, অপমানিত-ঘৃণিত এবং আত্মগ্লানিতে দগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করে। প্রখ্যাত ইতিহাসবেত্তা আসকার ইবনে শাইখ রচিত ’মুসলিম আমলে বাংলার শাসনকর্তা’, ড. মুহাম্মদ ফজলুল হক রচিত ‘বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ’, রমেশচন্দ্র মজুমদার রচিত ’বাংলায় ইংরেজ রাজত্ব প্রতিষ্ঠা’, নিখিলনাথ রায়ের লেখা’ মুর্শিদাবাদ কাহিনী’ গ্রন্থসহ বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থে তুলে ধরা হয়েছে, সিরাজ উৎখাতে পলাশি ষড়যন্ত্রে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিল প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে তাদের অতি করুণ দৃষ্টান্তমূলক পরিণতির বিশদ বিবরণ। কাউকে পাগল হতে হয়েছিল, কারো হয়েছিল অপঘাতে মৃত্যু। কাউকে নির্মম অপমৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয়েছিল। সবার ভাগ্যে জুটেছিল কোনো না কোনো ভয়াবহ পরিণতি। বাংলা অভিধানে বিশ্বাসঘাতকের সমার্থক শব্দ মিরজাফর। বিশ্বাসঘাতকদের সর্দার মীরজাফর পবিত্র কুরআন শরিফ মাথায় রেখে নবাবের সামনে তার পাশে থাকবেন বলে অঙ্গীকার করবার পর পরই বেঈমানি করেছিল। তার জামাতা মির কাসেম তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। 

পরবর্তীতে তিনি দুরারোগ্য কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে শাস্তিভোগ করতে করতে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেন। মীরজাফরের পুত্র মির মিরন ছিল সিরাজ হত্যার মূল নায়ক। সিরাজের মা আমেনার ঘোষিত অভিশাপ অনুযায়ী তাঁবুতে বজ্রপাতে আগুন ধরে গেলে মিরনের করুণ মৃত্যু ঘটে।  মুহাম্মদি বেগের মৃত্যু হয়েছিল বিকৃত মস্তিষ্ক নিয়ে অন্ধকার কূপে বিনা কারণে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যার মাধ্যমে। মিরকাসেম ইংরেজদের ভয়ে পালিয়ে বেড়ান এবং অজ্ঞাতনামা অবস্থায় দিল্লির রাস্তায় করুণ মৃত্যু ঘটে। মিরনের নির্দেশে নৌকা ডুবিয়ে তাকে হত্যা করা হয় ঘষেটি বেগমকে। জগত শেঠ এবং উমিচাঁদর মৃত্যু হয়েছিল গঙ্গায় ডুবে। ইয়ার লতিফ নিরুদ্দেশ হয়ে যান। ইতিহাস আজও জানতে পারেনি এই বিশ্বাসঘাতকের ভাগ্যে কী ঘটেছিল। ধারণা করা হয়, তাকে গোপনে হত্যা করা হয়েছিল। তহবিল তছরুপ ও অন্যান্য অভিযোগের বিচারে মহারাজ নন্দকুমারের ফাঁসিকাষ্ঠে মৃত্যু হয়েছিল।  ব্রিটিশ আমলে তিনিই ছিলেন প্রথম ভারতীয় যিনি দুর্নীতির কারণে ফাঁসির সাজা পান। বিষাক্ত সাপের কামড়ে দানিশ শাহ বা দানা শাহর মৃত্যু ঘটেছিল। রায়দুর্লভ কারাগারে ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়েই মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছিলেন। উমিচাঁদ পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতো এবং রাস্তায় তার মৃত্যু হয়। রাজ বল্লভ প্রমত্তা পদ্মায় ডুবে মরেছিল। ওয়াটসন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে অল্পবয়সে মারা যান। স্ক্রাফটনের মৃত্যু হয় কলকাতা থেকে বিলাত ফেরার সময় জাহাজডুবিতে। পলাশির যুদ্ধের অন্যতম খলনায়ক ক্লাইভ ভারতবর্ষ থেকে বিলাতে ফিরে যাওয়ার পর সে দেশের সংসদে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগের অপমান সইতে না পেরে বাথরুমে ঢুকে ক্ষুর দিয়ে নিজের গলা নিজে কেটে আত্মহত্যা করেছিলেন। এভাবে প্রায় সব বিশ্বাসঘাতকের মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। এটাই ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি। এ পরিণতি থেকে কেউ রক্ষা পায়নি।

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন