ঈদযাত্রা আনন্দময় ও নিরাপদ হোক

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২২, ০৯:১৪

ঈদযাত্রায় পদ্মা সেতু দিয়ে ঘরমুখী মানুষের ঢল নেমেছে। পদ্মা সেতু যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার পর থেকেই দক্ষিণবঙ্গের যাত্রীরা আরিচাঘাট খুব কম ব্যবহার করছেন। আর পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙা রুটে যাত্রীর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। এর প্রভাব পড়েছে রাজধানীর গুলিস্তান এবং সায়দাবাদ বাস টার্মিনালেও। এ দুটি টার্মিনালে যাত্রীর ভিড় লেগেই আছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শত শত যাত্রীকে পদ্মা সেতু উত্তর থানাসংলগ্ন মোড় থেকে গণপরিবহনে উঠতে দেখা গেছে। সেতু হয়ে স্বাচ্ছন্দ্য আর নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরতে পেরে খুশি সাধারণ যাত্রীরা। ২৬ জুন পদ্মা সেতু খুলে দেওয়ার পর থেকেই যাত্রীর চাপ রয়েছে এই রুটে। ঈদকে কেন্দ্র করে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ।

এদিকে পদ্মা সেতু দিয়ে দক্ষিণবঙ্গে শতাধিক কোম্পানি গাড়ি চালাতে আগ্রহী। ভোগান্তি এড়াতে নাড়ির টানে পদ্মা সেতু হয়ে গন্তব্যে ছুটছেন ঘরমুখী মানুষ। যুগ যুগ ধরে চলা ভোগান্তির অবসানে হাসি ফুটেছে বঞ্চিত মানুষের মুখে। বাংলাদেশের ধমনি প্রমত্ত পদ্মা অক্ষয় রূপ নিয়ে নিজের বিশালত্ব, সৌকর্য, শৌর্য ও সৌন্দর্যের এক মূর্ত প্রতীক। আমাজনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় খরস্রোতা নদী পদ্মাকে বশীকরণ করে জেগে উঠেছে স্বপ্নের সেতু। যে সেতু বিশ্ববাসীকে জানান দিচ্ছে বাংলাদেশের অহংকার, আবেগ ও আভিজাত্যের জৌলুস। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনমনীয় নেতৃত্ব, দৃঢ়সংকল্প ও স্থির প্রতিজ্ঞায় স্বপ্ন এখন বাস্তব। স্বপ্ন সত্যি করার উন্মেষলগ্নে গোটা জাতির মতো আনন্দে উদ্বেল দক্ষিণবঙ্গের বিপুল জনগোষ্ঠী। মূলত নাড়ির টানে ঘরে ফেরা মানুষের আসল যুদ্ধ শুরু হয় পবিত্র ঈদ এলেই। এই সময় আনন্দযাত্রা ভোগান্তি দিয়েই শুরু হয় মানুষের। যারা বাসে চড়েন ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাদের আটকে থাকতে হয় মহাসড়কে। যত কষ্টই হোক না কেন, নিজের জন্মস্থান গ্রামের বাড়িতে ঈদ উদ্যাপনে উদ্গ্রীব মানুষগুলো ছুটে আসছেন নিজ গন্তব্যে। পথে যতই ভোগান্তি ও দুর্ভোগ হোক না কেন পরিবার-স্বজনদের দেখা মিললে নিমেষেই মুছে যায় সব ব্যথা। তাই ঈদের এই মুহূর্তে মানুষের ভিড় লক্ষ করা যায়।

মুসলমানদের প্রধান দুটি ধর্মীয় উত্সবের একটি হচ্ছে ঈদুল ফিতর, অন্যটি ঈদুল আজহা। এ দুই উত্সবে রাজধানী ও অন্যান্য শহর থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ নাড়ির টানে পরিবার-পরিজনসহ গ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রতি বছর ঈদ উত্সবের আগমুহূর্ত থেকেই ঘরমুখী মানুষের মনে নিরানন্দের সুর ধ্বনিত হতে দেখা যায়। টিকিট কালোবাজারি, যানজট, ছিনতাই-ডাকাতি ও চাঁদাবাজি, জাল নোট, সড়ক ও লঞ্চপথে দুর্ঘটনা এবং শ্রমিক অসন্তোষের কারণে রাস্তা অবরোধসহ বিভিন্ন ঘটনায় জনদুর্ভোগ চরমে ওঠে। অতীতের ঘটনা থেকে প্রমাণিত—দেশের কোনো পথই ঘরমুখী মানুষের ঈদযাত্রার জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। সড়কপথ, নৌপথ, রেলপথ—ঈদের আগে কোথাও স্বস্তির কোনো চিত্র পরিলক্ষিত হয় না। নির্ঝঞ্ঝাট ও নিরাপদ ভ্রমণের প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ টিকিটের জন্য বাস, লঞ্চ ও রেল স্টেশনে ভিড় জমায়। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের টিকিট পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়ে। মূলত অতিরিক্ত অর্থোপার্জনের জন্য অবৈধ পন্থায় টিকিটের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এ সময় মানুষকে উচ্চমূল্যে টিকিট কিনতে বাধ্য করা হয়। ঈদের আগে এ ধরনের অনিয়ম-অব্যবস্থা মোটেই কাম্য নয়। প্রতি ঈদে নাড়ির টানে মানুষ নিজ বাড়িতে পরিবার-পরিজনের সান্নিধ্যে যায়। কারণ বছর শেষে আনন্দের দিনটি সবাই একসঙ্গে ভাগাভাগি করে নেবে। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে পদ্মা সেতুর মাধ্যমে যুক্ত হলো বাংলাদেশ। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সেই ক্ষণ গণনার মধ্যে সেতু নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন নদীতীরের মানুষ।

বাংলাদেশের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হলো সড়কপথ। অধিকাংশ মানুষ সড়কপথেই যাতায়াত করতে পছন্দ করেন। অবশ্য তাদের কাছে দ্বিতীয় কোনো পছন্দও নেই বলা চলে। কর্মব্যস্ত নগরী থেকে কিছু দিনের জন্য হলেও প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটাতে চিরচেনা সেই নিজ বাড়িতে ছুটে যায় তারা। সড়ক মহাসড়কে ঈদে ঘরে ফেরা মানুষের স্রোত বইছে। পথে পথে নানা প্রতিবন্ধকতা তাদেরকে আটকাতে পারে না। ঈদে বাড়ি ফেরা নিয়ে প্রতি বছরই থাকে নানা বিড়ম্বনা। আর এ দুর্ভোগের সবচেয়ে বড় কারণ হলো টিকিটের দুষ্প্রাপ্যতা। মানুষ আপ্রাণ চেষ্টা করে টিকিটের জন্য। কেউ পায় কেউ পায় না। যাত্রীদের বাস, রেল, লঞ্চ সর্বত্র চলছে টিকিট কালোবাজারির ত্রাস। টিকিটের জন্য সর্বত্র এখন যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধের জন্য ভোর থেকে লাইন দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না সেই বহু কাঙ্ক্ষিত টিকিট। ব্যর্থ হয়েই অনেকে ফিরে আসে। ঈদে রাস্তায় যানবাহনের পরিমাণ বেশি থাকায় ছোটখাটো কারণেও বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি হয়। প্রতি বছরের মতো এবারও সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের উদ্যোগ বাস্তবমুখী। এর পরও মানুষের দুর্ভোগ কমানো যায় না। দুর্ভোগ কমাতে হলে প্রত্যেক গাড়ি চালককে সচেতন হতে হবে। নিজের একটু সুবিধার জন্য যেন হাজার হাজার মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি না হয়ে, সেই বোধ জাগ্রত করতে হবে। সবচেয়ে বেশি জরুরি সড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। এখন থেকেই সড়কগুলোর ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে পারলে হয়তো দুর্ভোগ কম হবে।

ঢাকাই হচ্ছে মানুষের প্রাণকেন্দ্র। তাই ঢাকাকে ঘিরে লাখো মানুষের কর্ম জড়িত। এতে ঈদকে কেন্দ্র করে ঘরে ফেরার মানুষের ঢল নামে সড়ক, নৌ ও রেলপথে। এক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিধানে যারা যে অবস্থানে আছেন তারা তাদের সঠিক দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হতে হবে। আনন্দের ঈদযাত্রা যেন বিষাদে পরিণত না হয়, এই প্রত্যাশা সবার। সরকারের একার পক্ষে কোনো কিছুই মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। নিজ নিজ দায়িত্ব বোধ থেকে আমাদের এসব দুর্ঘটনা রোধে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসা উচিত।

লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন