সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ডেঙ্গু প্রতিরোধ নিয়ে ভাবতে হবে

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২২, ০০:২০

চলতি বছর ডেঙ্গুতে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা ঘটল। জানুয়ারি থেকে  নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে প্রায় ২০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে কোনো বছর ডেঙ্গুতে এত মৃত্যু ঘটেনি। এ বছর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশই শিশু।

মূলত এডিস এজিপটি নামক এক জাতের মশার কামড় থেকে হয় এই রোগ। ছোট কালো রং, পায়ের সাদা এবং শরীরের রূপালি সাদা ব্যান্ড দেখে এদের শনাক্ত করা যায়। ফেলে রাখা টায়ার, প্ল্যাস্টিকের ড্রাম, ফুলের টব, ডাবের খোসা, দীর্ঘদিন পাত্রে জমে থাকা পানির মধ্যে বংশ বিস্তার করতে পছন্দ করে এই মশা। এক চামচ পানিতেই এরা ডিম পাড়তে পারে ও সেই লার্ভা থেকে সম্পূর্ণ প্রাপ্ত বয়স্ক মশা তৈরি হওয়া সম্ভব। এ মশা কামড়ানোর দুই থেকে ছয় দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এ রোগে জ্বর, গায়ে ব্যথা, পেট ব্যথা; বমিসহ, প্ল্যাটিলেট কমে যাওয়া, লিভার ফেইলিউর, কিডনি ফেইলিউরের মতো জটিল অবস্থা সৃষ্টি হয়ে রোগীর প্রাণসংশয় পর্যন্ত ঘটতে পারে। এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি। তাই প্রতিরোধই এই ভাইরাস মোকাবিলার একমাত্র পন্থা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, এই মুহূর্তে বিশ্বের অর্ধেক মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আর বছরে ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। ব্যাপারটি উদ্বেগজনক তো বটেই, বাংলাদেশের জন্য আরো বেশি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রক্তক্ষরা ডেঙ্গুর উৎপত্তির মূলে আছে নজিরবিহীন জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ভ্রমণবৃদ্ধি, মশক দমনের অভাব এবং জনস্বাস্থ্য কাঠামোর অবনতি। তাছাড়া অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ভালো কোনো পদ্ধতি না থাকা, অপরিচ্ছন্নতাও এডিস মশা বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ। আবার জলবায়ু পরিবর্তনও বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়াচ্ছে বলে বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে। সংস্থাটি বলেছে, এক ঋতুর সঙ্গে আরেক ঋতুর যে তফাত, বাংলাদেশে তা মুছে যাচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায়। ফলে ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে ঋতুভেদে আবহাওয়ার বৈচিত্র্য। প্রতিবছর গ্রীষ্মের সময়টা একটু একটু করে বেড়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে বর্ষাকালের পরিধি।

গবেষকদের মতে, এই মশা দেওয়ালে না বসে টেবিলে, সোফা, পর্দা ও ঝুলন্ত কাপড়ের নিচে অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে। তাই এসব জায়গায় অ্যারোসল স্প্রে করতে হবে। ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নির্মূলে রাস্তার স্প্রে-ম্যান ওষুধ স্প্রে করলেই হবে না। কারণ, এডিস মশা নালা, পুকুর, খাল, নদী বা আবর্জনার স্তূপে বংশবিস্তার করে না। এডিস মশা ঘরে থাকে, জন্মায় বাড়ির ভেতরে জমানো পানির পাত্রে। মাত্র ২ মিলিমিটার পানি পেলেই এই মশা বংশবিস্তার করতে পারে। কাজেই সিটি করপোরেশন, জেলা, উপজেলা এবং পৌরসভার পাশাপাশি এর সঙ্গে মানুষের সম্পৃক্ততা না বাড়ালে কোনো কিছুতেই সফলতা আসবে না।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, জৈবিক ব্যবস্থাপনা, রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ এবং যান্ত্রিক পদ্ধতির প্রয়োজন হলেও শুধু রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। বছরব্যাপী সারা দেশে এখন থেকে এডিস মশা নির্মূলে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, জৈবিক ব্যবস্থাপনা, রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ এবং যান্ত্রিক পদ্ধতির সমন্বিত ক্রাশ পরিকল্পনা নিতে হবে। মশার ডিম ধ্বংসে প্রয়োজনীয় গবেষণা বাড়াতে হবে। তাহলে কোনো ভাইরাসের আক্রমণ শুরু হলে সেটি নিয়ে কাজ করার মতো দক্ষ জনবল তৈরি হবে। তাছাড়া সাধারণভাবে পাঠ্যপুস্তকে ভাইরাস নিয়ে পাঠ থাকতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে ডেঙ্গু রোগের বিষয়টি লিপিবদ্ধ করা গেলে সবাইকে আরো বেশি আতঙ্কমুক্ত ও সতর্ক করা যাবে।

মনে রাখতে হবে, জনগণের প্রত্যক্ষ সংযোগ ছাড়া ডেঙ্গু বা বিভিন্ন রোগ ও মহামারি—কোনো কিছুর বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ গড়া সম্ভব হবে না। সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা আবশ্যক। তবে আতঙ্ক নয়, সতর্ক ও সচেতনতাই ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে পারে।

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন